Showing posts with label aapon. Show all posts
Showing posts with label aapon. Show all posts

Wednesday, April 13, 2016

আক্ষেপের জীবন!


সারাক্ষণই ভাবতে থাকি এটা নেই, সেটা নেই। আরো বেশি কেন পাচ্ছি না, আরো বেশি কেন হচ্ছে না? শুধু 'নেই' আর আক্ষেপের জগতে ঘুরে বেড়াই, প্রতিনিয়ত! বার্গারের সঙ্গে সস নেই কেন- বলে চিৎকারে আকাশ-মাটি এক করি! ম্যাচিং করা জীবনে কী পাইনি, তার হিসেব চলে সকাল থেকে রাত অব্দি।
অথচ যা পেলাম তা নিয়ে সন্তুষ্টির ছিটেফোটাও নেই। মৃত্যু'র ঠিক আগ মুহুর্তেও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে যাবো- 'আরো কিছু পেলাম না কেন?'

তাই হয়তো দশ বছর বয়সী এই আবু'র চোখে জীবনটা দেখা হয়ে উঠে না আমাদের। আক্ষেপের ক্র্যাচ বগলদাবা করে ঘুরে বেড়াই, অহর্নিশ! অসুখীই থেকে যাই একটা জীবন। আহ, জীবন!!


GMB Akash
March 9 ·
‘I did not get anything to eat yesterday. I slept hungry. But now I am feeling lucky to get this rotten bread. My shoes, cloth or food everything comes from this dump yard. Aren't you asking me about the odor? I was born in this place, someone left me here after my birth, smell of this place make me feel like a home. This is my home and these dogs, birds are my family.’
- Abu (10)

Saturday, March 26, 2016

স্বাধীন...




‘‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুল পরী, ফুল পরী লাল পরী, লাল পরী নীল পরী, সবার সাথে ভাব করি...”

এই সুর বারবার ফিরিয়ে আনে আমাদের সাদাকালো শৈশবের রঙীন স্মৃতি। ফেলে আসা দিনের কতোশতো প্রিয় মুখ ...! প্রানহীন রঙীন ঘোড়ায় চড়ে বসতেই বেজে উঠতো এই গান। এখনো নাকি তাই হয়। ইট-কাঠের যাদুর শহরে খানিক বিনোদন তো এটুকুই।

সেদিন আমার মেয়েটা এই আনন্দে ডুবে থাকল কিছুক্ষণ। আর গানটা বেজে উঠতেই চনমনে হয়ে উঠল আরো, হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে থাকল সুন্দর মুহুর্তটাকে। চোখের কোনায় কিছুটা বিস্ময়, মুখে এক চিলতে হাসি, মা’র দিকে তাকিয়ে যেন বলতে চাইছে- ‘আমি একা, দেখো তারপরও আমি কতোটা স্বাধীন...’

কিন্তু মেয়েটা বুঝবেও না এখন আর সেই ‘স্বপ্নপুরী’ নেই, লাল পরী আর নীল পরীদের রূপকথারাও মরে গেছে! ফুল পরি’রা ফুলের গায়ে ভুলেও বসে না আর.. আগামীর পথে শুধুই কাঁটা ছড়ানো...


দানব, দৈত্যদের দাপটে ‘ভাল’রা নির্বাসনে যাচ্ছে, প্রতিদিন। ‘বোকা মানুষ’রা অভিমান করে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহুর্তে, চিরতরে!
তারপরও সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যাওয়া এই অবেলায় অগ্রজদের মতো একটাই চাওয়া-‌‌‘‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে...”

Wednesday, January 6, 2016

খুব মনে পড়ছে ইব্রাহিম ভাইকে

এক টুকরো আলো এসে পড়লো ইব্রাহিম ভাইয়ের মুখে। মুখে এক চিলতে হাসি! তার ঠিক ওপরে যে চোখ দুটো জ্বলমল করছে, তার একটির আলো নেই! সেই কবে ছোটবেলায় কিছু বুঝে উঠার আগেই কী থেকে যে কী হয়ে গেল! থাক সেই ভুলে যেতে চাওয়া গল্প.. আজ বরং অন্য কিছু হোক..

টুয়েন্টিফোরের ঠিক সামনের রাস্তায় একপাশে ছোট্ট ছোট্ট দোকান। দু'পাশে দুইটা টুল, কেউ আবার চেয়ার সাজিয়ে রেখেছে। তাতেই সিগারেট, চা কিংবা বিস্কিট সঙ্গে আড্ডা। আড্ডাবাজিটা থাকলেও চায়ের দোকানে ঘন্টার পর বসে থাকার অভ্যাসটা কখনো ছিলো না! ছিলো না মানে আগে কখনো করিনি।

হয়নি, হবে না, করিনি, করবো না- এইসব গ্যারান্টির মৃুত্যু হলে আমরা কতো কী যে করি! একদিন ডিসেম্বরের শুরুতে সেই টুলের ধুলো মুছে আমিও বসতে শুরু করি।

চায়ের সঙ্গে আড্ডায় সংগতভাবেই একঘেয়ে সেই একটি প্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গই থাকতো তখন। তখন প্রতিবাদী কথাগুলোই বরং ভাল লাগত। এরই ফাঁকে আড্ডা যখন আরো একঘেয়ে হয়ে উঠতো, ধুলো আর সিগারেটের ধোয়া মাখামাখি করতো, আমি তখন চলে যেতাম সেই ঢুল-চেয়ার পেড়িয়ে ছোট্ট দোকানটার ভেতরে। সেখানটায় ভীড় নেই। তখনই একটু একটু করে জানা ইব্রাহিম ভাইকে।

আশ্চর্য্য হয়েই তখন লক্ষ্য করতাম আমার কিংবা প্রতীকের জন্য কতোটা উদিগ্ন তিনি। প্রতিদিন দেখা হলেই বিনয়ের সঙ্গে সেই খোঁজটাই নিতেন। আক্ষেপ ঝরে পড়তো উনার চোখে-মুখে। কিছুদিন যেতেই আরো অবাক হতে থাকলাম-চা, বিস্কিট যাই খাই, টাকা নিতে চাই তো না! রীতিমতো জোর করে প্রতিবার টাকা দিতে হতো তাকে। কোন দোকানির সঙ্গে এমনটা কী যায়!

দিনের পর দিন এমনটা চলতে থাকল! আমরা মুগ্ধতা নিয়ে দেখলাম, সর্বনাশা দিনেও কিছু মানুষ পাশে থাকে আমাদের, সাহস জুগিয়ে যায়। তারাও একটু একটু করে আপন হয়ে উঠে। আবার কিছু মানুষ বন্ধুত্বা হারায়ও, সম্ভবত...

আজ ইব্রাহিম ভাইকে খুব মনে পড়ছে!






Saturday, November 2, 2013

শুভ দীপাবলী




''প্রদীপেরা যারা শুধু দিলি তাপ, আলো দিতে ভুলে গেলি.. শিখায় শিখায় দিলাম বার্তা আজ শুভ দীপাবলী...''

Saturday, November 3, 2012

স্বাদ পূরনের সাধ্য..



কোথায় যেন খুঁজতে গিয়ে পুরনো ঢাকার জিভে জল আনা এই খাবারের তালিকাটা পেলাম। এই খাবারগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা স্মৃতি। আমার হারিয়ে যাওয়া সময়ও যেন ফিরে ফিরে আসছে...। আহ! ‘‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম...’’

সব ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে তখন ইচ্ছে মতো ছুটে যেতে পারতাম, এখানে সেখানে। ধুর ভুল বললাম, ব্যস্ততা কিসের আবার? স্বাদ পূরনের সাধ্য তখন তেমন করে ছিল না। তাতে যেন পুরনো ঢাকার সেই রাত জাগা সময়গুলো এখন আরো বর্নিল হয়ে ওঠছে। হায় রে মুঠো গলে পড়ে যাওয়া আমার হারানো সময়!
বেচারাম দেউরিতে নান্না মিয়ার মোরগ পোলাও খাওয়ার কথা ভুলি কি করে? ঝুনুর বিরিয়ানির স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে! চানখারপুলের নীরব হোটেলের কথা সারা জীবনই মনে থাকবে!

এখন স্বাদ পূরনের সাধ্য ঠিকই এসেছে কিন্তু নাগরিক ব্যস্ততায় সময় মিলছে কোথায়?

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- আমাদের নৈতিকতা যেভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এখনো কি সেই আগের মতোই আছে আমাদের পুরনো ঢাকা? পুরনো ঢাকার সেইসব জিভে জল আনা খাবার? নাকি এখানেও বানিজ্য এসে সব শেষ করে দিয়ে গেছে?

আমাদের ঐত্যিহ্যের অংশ হয়ে ওঠা পুরনো ঢাকার সেই সব খাবারের স্বাদ নিতে বড্ড মন চাইছে..





Thursday, June 28, 2012

প্রতীক্ষা

এমনিতে প্রতীক্ষা মানে কোনো ব্যক্তি, বস্তু, সময় বা ঘটনার আশায় থাকা।
অপেক্ষা করা আর প্রতীক্ষা প্রকৃতপক্ষে একই আভিধানিক অর্থ বহন করে। তবে প্রায়োগিক কিছু পার্থক্য আছে। অপেক্ষা শব্দটার অধৈর্য্য একটা একটা ব্যাপার আছে। অপেক্ষা ফুরোলেই শান্তি। অপেক্ষা করতে ভালো লাগে না।

কিন্তু প্রতীক্ষা অসীম সময়ের জন্য হতে পারে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেও প্রতীক্ষা করা চলে।
পিয়নের জন্য, রিকশাওয়ালার জন্য বা ছুটির জন্য অপেক্ষা করা যায়। কিন্তু প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করা যায় না; প্রেমিকার জন্য প্রতীক্ষা করতে হয়।

সোজা কথায় যার প্রতি টান নেই, ঘটনাটা হলে বাঁচা যায় এমন কোনো কিছুর আশায় থাকা অপেক্ষা। আর যার প্রতি মনের টান আছে, যার জন্য দিনের পর দিন বসে থাকা যায়, তার জন্য বসে থাকা হল প্রতীক্ষা।

Thursday, June 14, 2012

‘পাপ’


(এটা ঠিক গল্প নয়। আমি আসলে গল্প লিখতে জানি না। সত্য ঘটনার চরিত্রগুলো ঠিক রেখে শুধুই নাম বদলে এখানে তুলে রাখলাম। এটা আমাদের স্কুলের স্যুভিনির জন্য লিখেছিলাম।)

চারদিকে যেন উত্সবের আমেজ। গন্ডার দিয়া গ্রামে পার্বন লেগেছে! মে মাসের এই সময়টাতে এমন দেখা যায় না। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মাইকিংয়ের শব্দ, পূর্বপাড়া থেকে পশ্চিমপাড়া। বাজারে, স্কুলের মোড়ে মসজিদে সবখানেই ওই একটাই আলোচনা। ছেলে-বুড়ো সবাই এমন এক সুরে কবে যে শেষ কথা বলেছে তা মনে করতে পারছিলেন না নব্বই ছুঁই ছুঁই করা ফজর আলী মেম্বার। 

হবেই না কেন? আজ যে গন্ডার দিয়া সরকারি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক মমতাজউদ্দিন মজুমদারের বিদায় সংবর্ধনা। বিদায়ের সঙ্গে কষ্টের বসবাস সব সময়ই। কিন্তু তার এই বিদায়ের রাগীনিতে উত্সবের ছোঁয়াটাও আছে। তিনি যে জাতীয় পর্যায়ে দুইবারের স্বর্ণপদক জয়ী শিক্ষক। এলাকার গর্ব। তার মতো একজন মানুষকে তো আর সাদামাটাভাবে বিদায় দেয়া যায় না। তাইতো গত দুই সপ্তাহ ধরেই প্রস্তুতি চলছে। লেখা হয়েছে বিদায় বাণী, কেনা হয়েছে উপহার, তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। মনোহরদীর টিএনও সাহেব জানিয়ে দিয়েছেন তিনি হাজির থেকে বিদায় জানাবেন। মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর। ধারণা করা হচ্ছে, মাঠ উপচে পড়বে মানুষে। 

প্রিয় স্যারকে সংবর্ধনা দিতে চায় গ্রামের সবাই। কিন্তু যাকে ঘিরে এতো আয়োজন সেই মমতাজউদ্দিন মজুমদার সকাল থেকেই মনমরা হয়ে আছেন। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে সেই মাঝরাতে। এরপর ঘুমোবার কত যে চেষ্টা করেছেন লাভ হয়নি। মেডিটেশনের অভ্যাস আছে। সেটা করেও দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি।

দুঃস্বপ্নটা কিছুতেই মন থেকে মুছতে পারছেন না। অথচ আজ গর্বভরে হাসিমুখে বিদায় নেয়ার দিন তার। তার অনেক পুরনো ছাত্রছাত্রীরা ব্যস্ততা রেখে এরই মধ্যেই গ্রামে চলে এসেছে। সবাই দিনটা স্মরণীয় করে রাখতে চায়। শ্রদ্ধা জানাতে চায় প্রিয় মমতাজ স্যারকে।
এইতো গতকাল শেষ বিকেলে আয়েশা এসেছিল তার স্বামী নিয়ে। সালাম করে গেছেন স্যারকে। আয়েশা এখন ঢাকায় থাকে। কাজ করে সচিবালয়ে। স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে তার সুখের সংসার। অথচ দারিদ্র্যতার ছোঁবলে পরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল সব কিছু। সেটা ৩০ বছর আগের গল্প। মমতাজ স্যারের বয়সও তখন তেমন কিছু নয়। ক্লাসের সবার খুটিনাটি আচরণই চোখে পড়তো তার। এভাবেই একদিন আবিষ্কার করলেন আয়েশা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ক্লাসেও আসছে অনিয়মিত। এক-দুই ক্লাস করে অসুস্থতার কথা বলে চলে যাচ্ছে বাড়িতে। অথচ মেয়েটা অনেক মেধাবী। নিশ্চিত ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাবে।

মমতাজউদ্দিন মজুমদার বুঝতে পারলেন কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে। আয়েশার বাড়ি পাশের দাইদারি গ্রামে। সাইকেল নিয়ে সোজা চলে গেলেন সেখানে। খুঁজে বের করলেন আয়েশার বাবাকে। এরপরই বেরিয়ে আসলো ঘটনা।

তিনবেলার মধ্যে যদি একবেলাও খাবার না জুটে তাহলে কি আর পড়ায় মন বসে? স্কুল থেকে শরীর খারাপের কথা বলে এসে প্রায় প্রতিদিনই আয়েশা কাজ করতো পাশের ভুঁইয়া বাড়িতে। তাতেই জুটতো একবেলার খাবার। এমন ঘটনা নাড়িয়ে দিল মমতাজ স্যারকে। আয়েশার বাবাকে বললেন, বৃত্তি পরীক্ষার আগে ও আমার বাড়িতে থেকে পড়বে।
তাই হলো। তিন মাস পেট পুড়ে খেয়ে পড়াশুনা করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল আয়েশা। এরপর হাইস্কুলে পড়ার সময়ও খরচের একটা অংশ আয়েশাকে দিয়েছেন মমতাজ স্যার। উনার মতো মানুষের সংবর্ধনায় না থেকে কি পারা যায়?
এমন অনেকেই গতকাল এসে পা ছুঁইয়ে সালাম করে গেছেন তাদের প্রিয় স্যারকে।
কিন্তু মমতাজউদ্দিন মজুমদার স্বস্তিতে নেই। ফজরের নামাজ পড়ে সরকার বাড়ির পাশ দিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে এসেছেন। কথাও বলেছেন কয়েকজনের সঙ্গে। তারপরও মন ভাল হচ্ছে না। পুরনো একট স্মৃতি ফিরে এসেছে আবার। সবাই যেখানে তাকে সফল আর আদর্শ শিক্ষক বলছে, সেখানে নিজেকে শুধুই ব্যর্থ নয় অপরাধীও মনে হচ্ছে মমতাজ স্যারের।

গতকাল গভীর রাতে দেখা স্বপ্নটা যে নিছকই স্বপ্ন নয়। সেটা যে তার জীবনের ঘটে যাওয়া এক ঘটনা। আজকের এই বিদায়ের দিনে এসে নিজেকে আর ক্ষমা করতে পারছেন না তিনি।
এই যখন ভাবছিলেন, তখন বাড়ির বাইরে থেকে কেউ একজন ডাকছিলেন স্যারকে। অনিচ্ছা নিয়ে বিছানা ছেড়ে বাইরে গেলেন। গফুর চেয়ারম্যান এসেছেন। স্যারকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আপনার কাছে আমাদের অনেক ঋণ। আমি ঠিক করেছি স্বর্ণের মেডেল আজ আপনার গলায় পড়িয়ে দেব।

সকালের নাস্তা পড়ে রয়েছে সামনে। বছর কয়েক আগে ডায়াবেটিস হয়েছে। তাইতো নিয়ম মেনে চলতে হয়। দুটো আটার রুটি আর আলুর ভাজি। কিন্তু আজ মুখে যে কিছুই উঠছে না।
সেই স্বপ্নটা যেন গ্রাস করে ফেলেছে তাকে। 

ভাবনার স্রোতে ভাসতে ভাসতে মমতাজউদ্দিন মজুমদার চলে গেলেন ২০ বছর আগে। তখন মাত্রই প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। এমনিতেই নিয়ম শৃঙ্খলার ব্যাপারে দারুণ কঠোর তিনি। এবার তো দায়িত্বটা আরো বেড়ে গেল। 

গন্ডার দিয়া সরকারী প্রাথমিক স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করার তেমন রেকর্ড নেই। মমতাজ স্যারের কল্যাণে এটি উপজেলার সেরা প্রাইমারী স্কুলের একটি। কিন্তু এবার সেই নিয়মের ব্যাতিক্রমটাই যেন ঘটলো। ক্লাস ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করলো পুর্ব পাড়ার সালমা। পুরো স্কুলে ফেল ওই একজনই।

সবাই যখন রেজাল্ট নিয়ে হাঁসিমুখে বাড়ির পথে, সালমা তখন দাঁড়িয়ে টিচার্স রুমের সামনে। এই মুখ নিয়ে বাড়ি যাবে কি করে? আবার স্যারদের সামনে যেতেও লজ্জা পাচ্ছে!
সালমার এমন অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা খেয়াল করছিলেন স্কুলের পুরনো দপ্তরি রমজান আলী। তিনি জানতে চাইলেন, কিরে কী হয়েছে তোর?

সালমা পুরো ঘটনা খুলে বললো রমজান চাচাকে। রমজান আলীও তার মতো করে একটা বুদ্ধি বের করলেন। বললেন, কিছু টাকা এনে স্যারদের খাওয়াও। তারা তোমারে পাশ করাইয়া দিব।

প্রস্তাবটা খারাপ মনে হলো না সালমার। কিন্তু সমস্যা হলো ও টাকা পাবে কোথায়? বাড়িতে ফেল করার কথা বলবে নাকি চুরি করে টাকা জোগাড় করবে তাই নিয়ে দ্বিধায় থাকলো কিছুক্ষণ। কিন্তু ঘরে তো তেমন কিছুই নেই। কী বিক্রি করবে? তেমন কিছুই খুঁজে না পেয়ে চোখ গেল চালের ড্রামের দিকে। ঢাকনা খুলতেই দেখলো সেখানে কিছু চাল জমা আছে। তাই তুলে নিল গামছায়। বাজারে নিয়ে তা বিক্রি করে ৮ টাকা পেল।  

সেই টাকা নিয়ে যখন স্কুলে গেল তখন সাড়ে তিনটা বাজে প্রায়। কিছুক্ষণ পরই স্যাররা বাড়ি চলে যাবেন। ভাবলো, সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কোন অর্থ হয় না। সালাম দিয়ে সালমা ঢুকে পড়ে টিচারদের রুমে।

কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই মুখস্ত বুলির মতো বলতে থাকে, স্যার আমারে পাশ করাইয়া দেন। আমি ৮ টাকা নিয়া আইছি। এইটা দিয়া আপনাদের চা-বিস্কুট কিন্না দেই। আমারে ফিরাইয়া দিয়েন না স্যার। আমি ক্লাস সিক্সে উঠতে চাই। আমি পড়া লেখা করতে চাই।
জলিল স্যার বয়স্ক মানুষ। তার মেজাজ সারাক্ষণই চড়া। এমন কথা শুনে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, তোর এত্তো বড় সাহস! ঘুষ দিতে আইছস। যা এক্ষুনি! জলিল স্যার তো মারতেই যাচ্ছিলেন। তাকে থামালেন তানিয়া ম্যাডাম।

মমতাজউদ্দিন পুরো বিষয়টাই দেখছিলেন। তিনি শিক্ষক মানুষ। নিয়মের বাইরে তো আর যেতে পারেন না। কিন্তু আবেগ বলেও তো একটা কথা আছে। কিছুক্ষণ ভাবলেন। শেষে সালমাকে ডেকে বললেন, আমাদের কিছুই করার নেই। ভালভাবে পড়াশোনা করো। পরেরবার পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠো।

স্যারদের এমন কথা আর আচরণের পরও বেশ ক্ষানিকক্ষণ সালমা দাঁড়িয়েছিল। চোখের জলও ফেলছিল। যদি তাতে কিছুটা দয়া হয়! কিন্তু হলো না।

এবার বিপদটাতো আরো বেড়ে গেল। ফেলের সঙ্গে যোগ হলো চুরি! কী করবে সালমা ভেবে উঠতে পারে না। অস্থিরতা বেড়ে যায় আরো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু কোন মুখে ফিরবে ও?

ভুঁইয়া বাড়ির বাগানের বেল গাছে সালমার ঝুলন্ত লাশ দেখে পরদিন ভোর হয় গন্ডারদিয়া গ্রামে। আ্ত্তহত্যা করে সালমা। সবাই এটাই জানতে পারে চুরির লজ্জা থেকে বাঁচতেই আ্তাাহুতি দিয়েছে ১১ বছর বয়সী মেয়েটি। 

স্বপ্নে দেখা এই বাস্তব ঘটনাই যখন পোড়াচ্ছিল মমতাজ স্যারকে, তখন আবার বাইরে থেকে ডাক আসে- স্যার চলেন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় হইছে। স্কুলের দপ্তরি বদি মিয়া নিতে এসেছে মমতাজ স্যারকে। কিন্তু কিছুতেই যে সেখানে যেতে মন চাইছে না তার। তার মতো একজন ব্যর্থ মানুষের জন্য সংবর্ধনা-টংবর্ধনা কেন?

সালমার ওই মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করেন তিনি। ওই দিন তাকে পাশ করিয়ে দিলে এমন ঘটনা হয়তো ঘটতো না। সবাই যাই জানুক তিনি জানেন এই মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী।
স্বপ্নে দেখা সালমার সেই আর্তনাদ কানে বাজছে- স্যার আমারে বাঁচতে দিলেন না।
বাড়ির বাইরে থেকে বদি মিয়ার আবার তাড়া স্যার জলদি আসেন।
 
গ্রামের চিকন আইল ধরে মমতাজউদ্দিন ধরেছেন স্কুলের পথ। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে মাইকে কেউ একজন বলছে এলাকার গর্ব, দুইবারের স্বর্ণপদক জয়ী সফল শিক্ষক মমতাজ স্যার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হবেন।
 
শ্রেষ্ঠ, সফল, গর্ব এই শব্দগুলো জ্বালা দিতে থাকে স্যারকে। মমতাজউদ্দিন মজুমদার ভাবতে থাকেন, আজ এমন দিনে আমার ওই অপরাধের গল্পটাও সবার জানা উচিত। তাতে যদি পাপ বোধ কিছুটা কমে!

মাথা নিচু করে স্কুল মাঠ দিয়ে হেটে যাচ্ছেন মমতাজ স্যার। দু পাশে সহস্র হাতের করতালি। প্রায় সবাই তার ছাত্র-ছাত্রী। সবাই দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে প্রিয় স্যারকে। কিন্তু মমতাজউদ্দিন মজুমদার তখন অন্য এক জগতে! চোখের জল ফেলে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কানে বাজতে থাকে সেই মর্মস্পর্শী আর্তনাদ- স্যার আমারে বাঁচতে দিলেন না।

মাথাটা আরো নিচু হয়ে যায় স্যারের। পা যেন চলছেই না। হু হু করে উঠে মনটা। চোখে তখন নোনা জলের বন্যা।

২০ বছরের জমানো জলের ধারা কী এতো সহজে থামে!


Saturday, May 12, 2012

শুভকামনা ও অতল ভালবাসা



ভালবাসা নাকি বাতাসের মতো! আপনি চাইলেই তা দেখতে পারবেন না। কিন্তু ঠিকই অনুভব করতে পারবেন! এই যেমন আমি এখন সিলেট থেকে ২৪৮ কিলোমিটার দুরে থেকেও সাকি আর সুবর্নার ভালবাসা অনুভব করতে পারছি।
চায়ের শহরের দুটো মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন দিনে আমাকেও পাশে চাইছে। আনন্দ ভাগাভাগির সময় যখন হলো তখন আমাকে তারা কাছের মানুষ ভাবছে, ভাল লাগলো! নাগরিক যন্¿না কিংবা নষ্ট সময় আমাদের এতোটাই স্বার্থপর করে ফেলেছে যে দুঃখের দিনেই কেবল বন্ধু-কাছের মানুষদের মনে পড়ে। সুবর্না-সাকি তেমন নয়! সুখটাও ওরা ভাগ করে নিতে জানে।

সাকির সঙ্গে পরিচয়টা মুঠো ফোনে। বছর ছয়েক আগে হবে হয়তো। হঠাত্ একদিন কথা হলো। এরপর পেশাদ্বারিত্বের টানেই কথা হতো প্রায় নিয়মিত। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্পকর্টা শুধুই পেশাদারিত্বে আটকে থাকেনি। সেটা না হলে কি আর পারিশ্রমিকের ব্যাপার ভুলে ওভাবে কেউ দিনের পর দিন লিখে যেতে পারে? ধন্যবাদ দিলে ছোট করা হয়ে যাবে সাকির ওই আন্তরিকতা!
সুর্বনার সঙ্গে পরিচয় ওই মুঠো ফোনেই। এরপর সেই পরিচয়টা দিন দিন মজবুত হয়েছে আরো। যখন সুবর্না নারী সাংবাদিক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার জিতলো তখন মনে হচ্ছিল এ অর্জন যেন আমারও! কাছের কেউ সম্মানিত হলে নিজেকেও সম্মানিত মনে হয়।

সাকি-সুবর্না তাদের মধুরতম দিনগুলোর প্রতীক্ষায়। আমার দুজন প্রিয় মানুষ সারা জীবন সুখে-দুঃখে একসঙ্গে থাকার সিদান্ত নিয়েছে! ওদের জন্য অতল ভালবাসা, শুভকামনা। হাসি-মুখ দেখতে চাই সারা জীবন।

সুখী হতেই হবে...

Friday, March 30, 2012

রোদ্দুর


''সারাটা রাত দরজা ধরে দাড়িয়েছিলেম ঠায়
হঠাৎ দেখি রোদ পড়েছে ভোরের বারান্দায়..''

অনেক প্রতীক্ষার ‌‌‌পর 'রোদ্দুরে' দেখা মিলেছে.. :)))

Wednesday, December 21, 2011

জীবন বহতা নদীর মতো..



..একটা গোলাপ রাত-দিন অহর্নিশ মৌমাছির কথা ভাবতো, কিন্তু কখনোই তার পাপড়িতে এসে মৌমাছি বসেনি!

তাতে কি? গোলাপটি তারপরও স্বপ্ন বুনে যেতো। সারারাত জেগে সে ভাবতো সেই স্বর্গের কথা যেখানে অনেক অনেক মৌমাছি উড়ে এসে বসতো তার পাপড়িতে আর মমতাময় চুমুতে ভরিয়ে দিত তাকে! এভাবেই একসময় ঘুমিয়ে পড়তো। টিকে থাকতো পরের দিন পর্যন্ত যখন সূর্যের আলোতে তার ঘুম ভাঙতো।

আকাশের ওই চাঁদ জানতো তার এই একাকিত্বের কথা। এক রাতে চাঁদ তাকে জিজ্ঞেস করলো-তুমি যে এতো অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওনা?

-হয়তো হই। কিন্তু আমাকে যে চেস্টা করে যেতেই হবে।

কেন?

কারণ আমি যদি নিজেকে এভাবে মেলে না রাখি, তাহলে তো একদিন মিলিয়ে যাবো।

যখন একাকীত্ব সমস্ত সৌন্দর্যকে পিষে ফেলতে চায়, তখন টিকে থাকার একমাত্র উপায় মনকে মেলে রাখা...।

                                  .................................

এটা পাওলো কোয়েলোর লাইক দ্য ফ্লোইং রিভার (Like the Flowing River) বইয়ের রিমেনিং ওপেন টু লাভ গল্পের কিছুটা অংশ। যখন সত্যিই আমি ক্লান্ত হয়ে উঠি তখন এই গল্পটা বারবার অনুপ্রেরনা হয়ে উঠে আমার জন্য। কতোবার যে এটা পড়েছি হিসেব নেই। এর আগে ফ্লিকারেও একটা পোষ্ট করেছিলাম। তুলে রাখলাম আমার ব্লগে।

আমার অনুবাদ পড়ে ক্লান্ত হয়ে উঠলে মুল ইংরেজি অংশটি পড়ে নিতে পারেন।  


A rose dreamed day and night about bees, but no bee ever landed on her petals.

The flower, however, continued to dream. During the long nights, she imagined a heaven full of bees, which flew down to bestow fond kisses on her. By doing this, she was able to last until the next day, when she opened again to the light of the sun.

One night, the moon, who knew of the rose's loneliness, asked: 'Aren't you tired of waiting?'
'Possibly, but I have to keep trying.'
'Why?'
'Because if I don't remain open, I will simply fade away.'

At times, when loneliness seems to crush all beauty, the only way to resist is to remain open...

Tuesday, December 13, 2011

sombre


aaaand my mood is also very melancholic and moody... sometimes I just adrift. as if I fall asleep with eyes wide open in the public... I still see people in front of me talking and me saying yes, but my mind just Thirst For You.. though I would really like to be present, to be eager - so that time goes by quickly and I am sooooon back with you..., but I just can't... 

my mind just adrifts...


ফ্লিকারে অনেক আগে এই ছবিটি পোষ্ট করেছিলাম। কক্সবাজার থেকে ইনানী যাওয়ার পথে তোলা। বিষণ্ন, আমারই মতো।

পাখিটা আসলে কি বলতে চাইছে?

সেদিন রোদ ছিল না আকাশে। কুয়াশা উড়ছিল! শীতের অলস দুপুরে কিছুই ভাল লাগছিল না আমার। চারদিকে এতো হাসি, এতো উচ্ছাস কিছুই যেন টানতে পারছিল না আমাকে। সবার সঙ্গেই ছিলাম। কিন্তু কারোর সঙ্গেই ছিলাম না! কতো কথাই বলছিল আমার বন্ধুরা। হেসে গড়িয়ে পড়ছিল একেক জন। আমি মাথা-নাড়ছিলাম। হাসি-হাসি মুখ করছিলাম। সঙ্গ দিচ্ছিলাম ওদের। অথচ কি নিয়ে কথা হচ্ছে, তারা কেনই বা এতো উচ্ছসিত- কিছুই যেন শুনছিলাম না সেদিন..!

এমন করে এর আগে কখনো কি কাউকে ভালোবেসেছিলাম? এমন করে কেউ কি এর আগে বিষন্ন করে তুলেছিল আমাকে? এতোটা ভালোবাসা! এতোটা অনুভব!

ভাবছিলাম... ভাবছিলাম, কতো কিছু!

কি আশ্চর্য্য প্রায় তিন বছর পরে এসে এখনো আমার ভাবনাগুলো ঠিক একইরকম! এখনো আমি সেই আগের আমি! মানুষ নাকি বদলায়। তাহলে আমি কেন...

এখনো তেমন করেই তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠি আমি। অদ্ভুদ এক বিষণ্নতা অহর্নিশ ঘিরে থাকে আমাকে। হয়তো প্রশ্রয় পেয়ে আমার এইসব তৃষ্ণা, বিষণ্নতা কিংবা ভাবনা আমাকে গ্রাস করে ফেলছে, প্রতি দিন একটু একটু করে..! 

কোন খেয়ালে ভেসে যাচ্ছি আমি?

Sunday, December 11, 2011

শিরোনামহীন..

অনেক দিন আগের কথা.. অনেক অনেক দিন আগের গল্প। জানি না কেন কি ভেবে আকাশে উড়তে ইচ্ছে হলো! কেউ একজন আমাকে বললো- সম্ভব। পৃথীবির সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুদিত এক বইয়ে নীল অক্ষরে লেখে দিলো, ‘কোন কিছুই অসম্ভব নয়। যদি যে নিরন্তর চেস্টা চালিয়ে যায়..'’ 


এরপর সকাল, বিকেল, সন্ধ্যে চলতে থাকলো আমার চেস্টা। নিরন্তর চেস্টা। প্রতীক্ষা দিনের পর দিন। তারপর একদিন খুব করে চেস্টা করলাম উড়তে! দু হাত দুদিকে বাড়িয়ে দিলাম.. চোখ বন্ধ করে শুন্যে ভাসিয়ে দিতে চাইলাম নিজেকে। হলো না! এতো চেস্টার পরও ওই পাখিটার মতো উড়তে পারলাম না
তাই বলে হাল ছাড়িনি। 


এখনো সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা চলতে থাকে আমার নিরন্তর চেস্টা! অসম্ভব কে সম্ভব করার সেই খেলা থামাই কি করে? নীল অক্ষরগুলো যে আমাকে প্রতিটি মুর্হুতেই বলে যাচ্ছে- ‘সম্ভব.. কোন কিছুই অসম্ভব নয়। যদি যে নিরন্তর চেস্টা চালিয়ে যায়..

Thursday, May 6, 2010

ভারতীয় ছবিকে কেন ''না''?


অনেক ধরেই চলছে এই বিতর্ক! আমি নিজেও নিয়ে তর্কে মেতেছি বেশ কয়েকবার। ভারতীয় ছবি আমদানীর যে সিদান্ত নিয়েছে সরকার-তা কি যুক্তিযুক্ত?
 
আমার
প্রাথমিক অনুধাবন যুক্তিযুক্ত। কেননা, এখন সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার সংস্কৃতি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এফডিসি নির্ভর আমাদের চলচিত্রের করুন হাল। কাটপিস নামক মহামারি অবশ্য বন্ধ হয়েছে। কিন্তু শাকিব খান- ডিপজলদের ''ভালবাসা দিবি কিনা বল'' নামের সস্তা কাহিনী নির্ভর ছবি খুব বেশি দর্শকদের টানতে পারছে না।

এক
শাকিব খানের ছবি দেখতে দেখতেও ক্লান্ত দর্শকরা অবস্থায় এমন হয়েছে যে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হওয়ার হিড়িক শুরু হয়েছে। সিনেমা হল মালিকরা কতো দিন ক্ষতি পোষাবেন? তাইতো হল ভেঙ্গে নির্মিত হচ্ছে শপিং কমপ্লেক্স। গুলিস্তান সিনেমা হল হতে পারে বড় উদাহরন। আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠা এই সিনেমা হল ভেঙ্গে এখন সেখানে শপিং কমপ্লেক্স। হল মালিকরা বলছিলেন অবস্থা চলতে থাকলে তাদের ব্যবসা থেকে সরে যেতে হবে।

অনেকে বলছেন কম বাজেটের ছবি দিয়ে ভারতীয় ছবির সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকা যাবে না। কিন্তু চোখ ফেরান ষাট ও সত্তর দশকের দিকে। ওই সময়টাতে আমাদের ছবি প্রতিযোগিতা করেছে হলিউড, বলিউড আর টলিগঞ্জের উত্তম-সুচিত্রার সঙ্গে। হলিউডে ইংরেজি ছবি মুক্তির দিনকয়েক পরই তা ঢাকায় চলে আসতো। সঙ্গে হিন্দি আর ওপার বাংলার ছবি তো ছিলই। তারপরও দর্শকরা দল বেধে হলে গেছেন রাজ্জাক-কবরীর ছবি দেখতে!

তাহলে এখন কেন প্রতিযোগিতা সম্ভব নয়?

দেশের
সিনেমা শিল্পকে এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ভারতীয় ছবি আমদানির সিদান্ত নিয়েছিলো সরকার। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্তে ঘুম ভাঙ্গলো এফডিসি নির্ভর অভিনেতা-অভিনেত্রী- নির্মাতাদের।

তারা
এর প্রতিবাদে শুরু করলেন সভা-সমাবেশ। ঘোষনা করলেন কর্মসুচী। গলা ফাটিয়ে বললেন 'ভারতীয় ছবি এদেশে এলে ঢাকায় ছবির বাজার ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের শিল্পীরা পথে বসে যাবে। এটা হতে পারে না।'

শুরু
হয় আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত সরকার সেই সিদান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।


কিন্তু  প্রশ্ন হলো সিনেমা হলই যদি না থাকে তাহলে কি এফডিসি নির্ভর কমার্শিয়াল ছবিগুলো থাকবে? শাকিব খান ছবি প্রতি ৩০ লাখ টাকা করে পাবেন? -উত্তর অবশ্যই ''না' কারনেই সবার আগে বাঁচাতে হবে সিনেমা হল মালিকদের। তারপর অন্য চিন্তা। ঢাকার একটি হল মালিককে বলতে শুনেছি, যে মাসে অন্তত একটি ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি চাইছেন তারা। তাতে অন্তত কর্মাশিয়াল ছবি চালিয়ে যে ক্ষতি হয় তা পুষিয়ে নিতে পারবে। প্রস্তাবটা কি যৌক্তিক নয়?

কিন্তু না, এফডিসি থেকে ষ্পস্ট জানানো হয়েছে-কোন ভারতীয় ছবি দেখানো যাবেনা।  

এখন আবার তা বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছে। ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সিনেমা হলে মুক্তি পাবে ভারতীয় ছবি!

ভারতীয় সিনেমা বাংলাদেশে প্রদর্শনে খুব একটা সমস্যা দেখছি না। তবে অবশ্যই এ দেশের কিছু সিনেমা পশ্চিম বাংলায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকটা বিনিময়ের মতো। তাহলে তো কোন সমস্যা নেই!



এই বির্তক নিয়ে দেশের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিক নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদ কালের কন্ঠ - লিখেছেন অসাধারন এক কলাম। যার প্রতিটি লাইনের সঙ্গে আমি একমত। তাই এখানে তা তুলে রাখলাম-

বহুত
দিন হোয়ে
হুমায়ূন
আহমেদ

আমার
শৈশবের অনেক সুখ-স্মৃতির একটি হচ্ছে মা' সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়া। বিপুল উত্তেজনা, বিপুল আয়োজন। সিলেট শহরের নিয়ম অনুযায়ী বাসার সামনে রিকশা এসে থামত। শাড়ি দিয়ে সেই রিকশা পেঁচিয়ে ঘেরটোপ করা হতো। মহিলারা ঘেরটোপের ভেতরে। শিশুরা তার বাইরে রিকশার পাটাতনে বসে থাকত। কী আনন্দের দিনই না গিয়েছে। সিনেমা হল পর্যন্ত যাবার আনন্দ, সিনেমা হলের ঘণ্টি শোনার আনন্দ, পর্দায় বড় বড় ছবির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুট-বাদাম খাবার আনন্দ।
 
১৯৬৫
সালে পাক-ভারত যুদ্ধ বেধে গেল।
ফলাফল
তেমন কিছু হলো না, তবে আইন পাস হলো এই উপমহাদেশের কোনো ছবি পাকিস্তানে আসবে না। ভারতীয় ছবি বন্ধ হয়ে গেল। সেই সময়কার তরুণ তরুণীরা সুচিত্রা-উত্তমের জন্যে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল। তাদের আশা একসময় সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। তখন ছবি দেখা যাবে।
 
তারপর
অনেক দিন পার হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ পানি বিষাক্ত হয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে, ১৯৬৫ সালের আইন কিন্তু বদলায় নি। এখন আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে পারব কিন্তু তাদের ছবি আনতে পারব না।
কারণটা
কী?
পাকিস্তানি
ভূত আমরা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছি কেন? উত্তর হচ্ছে দেশের ছবিকে প্রটেকশন দেওয়া। ভারতীয় ছবি এলে আমাদের ছবি বিকশিত হবে না ইত্যাদি। পঁয়তালি্লশ বৎসর আমাদের ছবিকে প্রটেকশন দেওয়ার ফলাফল কী হয়েছে তা সবাই জানেন। এফডিসিতে যেসব রসগোল্লা তৈরি হয়েছে তা আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই চেখে দেখেন নি।
 
বাংলাদেশী
ছবির প্রযোজকরা জানেন, তারা যা তৈরি করবেন দর্শকদের তাই দেখতে হবে। দর্শকদের হাতে কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের
ছবির প্রযোজকরা বলেছেন, ভারতীয় ছবি বাংলাদেশে এলে বাংলাদেশের ছবির বারোটা বেজে যাবে। প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারব না। আইন করে আমাদের প্রতিযোগিতার বাইরে রাখতে হবে। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও আমাদের প্রটেকশন দিয়েছেন, ইত্যাদি। সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট বলে যে কথাটি আছে আমাদের দেশে চিত্র নির্মাতা সেটা জানেন না। এই দেশের আইন হলো আনফিটকে সারভাইভ করার সুযোগ দেওয়া। এরচেয়ে হাস্যকর কিছু হতে পারে বলে আমি মনে করি না।
 
এখন
যদি লেখকরা বলেন, আমাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে আমরাও প্রটেকশন চাই। বাইরের কোনো লেখকের বই বাংলাদেশে আসতে পারবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি সেই প্রটেকশন দেবেন? নাকি ছবির প্রটেকশন দিয়ে যাবেন এবং চিত্র নির্মাতারা, "প্রেম না দিলে লাত্থি খাবি?" জাতীয় ছবি বানিয়ে যেতে থাকবেন। এবং একের পর এক আমাদের সিনেমাহলগুলি মার্কেট হতে থাকবে। সাধারণ মানুষের বিনোদন বন্ধ।
কেউ
যেন মনে না করেন হিন্দি ছবি দেখার জন্যে আমি ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছি। আমি হিন্দি জানি না এবং হিন্দি ছবির ফর্মুলা পছন্দ করি না। একসঙ্গে তিনশ নর্তক-নর্তকীর নৃত্য আমাকে আলোড়িত করে না। তবে আমার জীবনে দেখা প্রথম ছবিটি একটি হিন্দি ছবি নাম 'বহুত দিন হোয়ে' এই তথ্যটা না জানালে ভুল হবে।
 
বাণিজ্য
মন্ত্রী ফারুক খানকে আন্তরিক ধন্যবাদ যে দীর্ঘ পঁয়তালি্লশ বছর পার হলেও তিনি একটি শুভ উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন যুক্তিতে একটি শুভ সূচনার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করলেন তা আমি জানি না। আমি তাঁকে পুনর্বিবেচনা করতেও বলব না কারণ বলে লাভ নেই। প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সূর্য। তাঁকে ঘিরে থাকবে গ্রহ, উপগ্রহ। তারা প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খাবে।প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা এবং পরামর্শ শুনবেন। পত্র-পত্রিকায় যারা লিখবেন তারা গ্রহ-উপগ্রহের বাইরে। কে শুনবে তাদের কথা?

আমি
একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে লেখার ইতি টানছি। এক চলচ্চিত্র উৎসবে হঠাৎ করে সত্যজিৎ রায়ের মহানগর ছবিটি এসেছে। বলাকা সিনেমাহলে পরপর কয়েকটি শো হবে। আমি তখন মুহসীন হলের ছাত্র। টিকিটের জন্যে সারারাত হলের সামনে লাইন দিয়ে বসে থাকলাম। সকাল এগারোটায় কাউন্টারের সামনে এসে জানলাম টিকিট শেষ। কি কষ্টটাই না পেয়েছিলাম। ১৯৬৫ সালের একটি ভুল আইনের কারণে একটা ভালো ছবি দর্শকরা দেখতে পেল না।
আমি
নিজে একজন শখের ফিল্ম মেকার। অনেকগুলি ছবি বানিয়েছি, আরও বানাব কিন্তু আমি আমার ছবির জন্যে প্রটেকশন চাইব না। অন্য দেশের ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারলে, টিকব না পারলে নাই।
বাংলাদেশের
ছবির জগতে এক ধরনের মনোপলি ব্যবসা চলছে। ইসলাম ধর্মে কিন্তু মনোপলি ব্যবসা নিষিদ্ধ।

যাই
হোক আমরা পঁয়তালিলশ বছর পার করেছি। একসময় একশ বছর পার করব। উপমহাদেশের ছবি আমদানি নিষিদ্ধের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব হবে। দুর্ভাগ্যবশত প্রাকৃতিক কারণে সেই উৎসবে আমি থাকতে পারব না। একশত বছরের প্রটেকশন পেয়ে আমাদের ছবি কতদূর চলে যাবে তা দেখার একটা শখ অবশ্যি ছিল।

*************************************


((
বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে। তাইতো পোস্টের আপডেট দিতে বাধ্য হলাম। ১০ মে প্রথম আলোতে চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা। তারা ভারতীয় ছবি আমদানির বিপক্ষ। এখানে সেই যৌথ কলাম তুলে রাখলাম-))

প্রতিযোগিতা নয়, বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা

মোরশেদুল ইসলাম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা

ভেবেছিলাম
, এই যাত্রায় ভারতীয় ছবি আমদানির প্রসঙ্গটা চুকে গেল।
কিন্তু
প্রথম আলোসহ বেশ কিছু পত্রিকায় প্রসঙ্গে নতুন করে লেখা ছাপা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হলো, আমাদের আসলে কিছু বলার আছে এবং সেটা বলা দরকার।
 
আমরা
তিনজনের একজনও ভারতবিদ্বেষী নই। এমনকি আমরা সরকারবিরোধী কোনো এজেন্ডার ধারক বাহকও নই। আমরা তিনজনই ছবি বানাই, বানাতে চাই। বাংলাদেশে নতুন সিনেমার পাল তোলার যে লড়াই চলছে, আমরা তিনজনই তার ক্ষুদ্র শ্রমিক। আমাদের এই লেখায় আমরা প্রথমে বোঝার চেষ্টা করব, যাঁরা ভারতীয় ছবি আমদানির পক্ষে বলছেন, তাঁদের যুক্তিটা কী।
প্রথম
যুক্তি, সিনেমা হল মরে যাচ্ছে। সিনেমা হলকে বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশের ছবি দিয়ে সিনেমা হলগুলো দর্শক টানতে পারছে না। অর্থাৎ সিনেমা হলগুলো ভালো চলছে না। সুতরাং ভারতীয় ছবি আনো এবং সিনেমা হল বাঁচাও।
  
আমাদের বিনীত প্রশ্ন, ‘সিনেমা হল বাঁচাতে হবে কেন?’ উত্তর আসবে, ‘সিনেমার জন্য এরপর জিজ্ঞেস করব, ‘কোন সিনেমার জন্য?’ উত্তর কী আসবে? ভারতীয় সিনেমার জন্য? ভারতীয় সিনেমার প্রচার প্রসারের জন্য আমাদের সিনেমা হল বাঁচিয়ে রাখার দরকার কী? যদি ভারতীয় ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্যই সিনেমা হলকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে তো সিনেমা হল ভেঙে ফেলে শপিং কমপ্লেক্স করাই ভালো।
দ্বিতীয়
যুক্তি, প্রতিযোগিতা।বাংলাদেশের সিনেমাকে ৩৮ বছর সুরক্ষা দিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে কী এমন ঘোড়ার ডিমের ছবি উপহার দিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র? বাংলা সিনেমাকে টিকে থাকতে হলে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে।পাঠকমাত্রই নিশ্চিত জানেন, ৩৮ বছর ধরে বাংলা চলচ্চিত্র যে ধারায় চলেছে এবং যেসব অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে, আমরা কেউই তার ভক্ত না। আরও অনেক নবীন-প্রবীণ সহযোদ্ধার সমন্বয়ে আমরাও সেই ধারাকে বদলাতে চাইছি। কিন্তু সেই ধারা বদলানোর রাস্তা যদি হয় হিন্দি সিনেমাকে অবারিত করে দিয়ে বাংলা ছবি চালানোর জন্য হল খুঁজে না পাওয়া, তাহলে আমরা বলব, এটা টিউমার সারাতে গিয়ে মাথা কেটে ফেলার মতো প্রাণঘাতী সমাধান।

৩৮ বছর আমরা বাংলাদেশের সিনেমা থেকে কিছু পাইনি। তাহলে আশা করা যাচ্ছে, হিন্দি সিনেমা বাংলাদেশে এলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির পরিচালকেরা বদলে যাবেন এবং গিয়ে ভালো ছবি উপহার দেবেন? কিংবা আরও আগে যদি হিন্দি সিনেমাকে অবারিত করে দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের পরিচালকেরা সেই কবেই বদলে গিয়ে ভালো ভালো ছবি উপহার দিতেন? প্রিয় ভাই বোনেরা, বাংলা সিনেমার মূল সমস্যাটা প্রতিযোগিতার অভাব নয়। বাংলা সিনেমার মূল সমস্যাটা ছিলমেধার অভাব কয়েক দশকের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, ভিডিও মাধ্যমের বৈপ্লবিক বিস্তার, পাইরেসির কল্যাণে পৃথিবীর সব প্রান্তের ছবির সহজপ্রাপ্তিএই তিনের প্রভাবে আজকে প্রথমবারের মতো একটা প্রজন্মকে দেখা যাচ্ছে যারা সিনেমাটা ঠিকঠাক বোঝে, আধুনিক সিনেমার করণকৌশল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং যারা বাস্তবেই বাংলাদেশের সিনেমার মানচিত্র বদলানোর স্বপ্নে হাতে-কলমে কাজ করছে, তাদের অনেককেই সিনেমা হল আর টেলিভিশনের কল্যাণে আমরা চিনি। তবে বৃহৎ অংশকেই চিনি না, যারা নিজেদের মতো করে প্রস্তুত হচ্ছে। আপাতত তারা ভিডিওতে ছোট ছবি করছে। কিন্তু স্বপ্ন, একদিন বড় পর্দা দখল করার। এরা সংখ্যায় শত-সহস্র। এই যে চারদিকে এত ছেলেমেয়ে ছবি নির্মাতা হতে চায়, এই যে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির উৎসবে এত ছবি জমা পড়া, এই যে এত বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম ক্লাবগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি, এই যে ১০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু আনাগোনাএসব কিসের ইঙ্গিত বহন করে? সবকিছু একটাই ইঙ্গিত বহন করে যে আমাদের সিনেমা বদলানোর জন্য একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে।

ঠিক মুহূর্তে আমরা যদি সিনেমা হলগুলো ভারতীয় ছবির হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে এত দিনে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার ক্ষেত্রটাঅঙ্কুরেই বিনষ্টহবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে নতুন ছবি নির্মাতারা যেন তাঁদের ছবি চালানোর মতো হল পান।
একটা
কথা পরিষ্কারভাবে বলা দরকার, আমরা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিযোগিতাকে ভয় পাই না। আমরা ভারতীয় টেলিভিশন আর বিজ্ঞাপনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে আছি। এবং আমরা এও বিশ্বাস করি, ভারতীয় ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার ক্ষমতাও আমাদের আছে। কারণ, বাংলাদেশের জীবনের গভীরে যে সুর আছে, তা একমাত্র আমাদের ছবিতেই বাজবে, কোনো ভারতীয় ছবিতে নয়। ফলে আমাদের ছবি দেখাতে আমরা হলও পাব, দর্শকও পাব। কিন্তু একজন নতুন পরিচালকের কী অবস্থা হবে? তাকে কি হল দেওয়া হবে?

ভারতের
অডিও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই আমাদের অডিও ইন্ডাস্ট্রি টিকে আছে। আমাদের বইয়ের বাজারও প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। কেউ কেউ বলছেন, সুতরাং সিনেমাও প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকুক। সিনেমার ব্যাপারটা একটু আলাদা। একটা বইয়ের দোকানে বা সিডির দোকানে আপনি একই সঙ্গে বাংলাদেশি বা ভারতীয় হাজারটা পণ্যই রাখতে পারেন, যার যেটা ভালো লাগবে বেছে নিয়ে যাবে।
কিন্তু
একটাবলাকাবারানীমহলেআপনি সপ্তাহে একটা ছবিই তুলতে পারবেন। ফলে সেইএকটাযদি হয়হিন্দিএকটা, তাহলে আমার দেশের বাংলা ছবিটার জন্য হল পাওয়া যাবে কোথায়? হল পাওয়া গেলেই না প্রতিযোগিতা!! আমাদের দেশের মানুষের দেশপ্রেমের যে অবস্থা, সমমানের স্বদেশি বিদেশিদুটি পণ্য পাশাপাশি রাখলে বিদেশিটাই বেছে নেন, তাতে চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, হলের মালিকেরা হিন্দি ছবিই তুলতে চাইবেন, বাংলাদেশের ছবি নয়। তা ছাড়া ১০০ কোটি টাকার ছবি আর ৫০ কোটি বিপণন বাজেটের ছবির সঙ্গে তো বাংলাদেশের ছবির প্রতিযোগিতা হতে পারে না। এটা অসম প্রতিযোগিতা।
 
সারা
দুনিয়ার সিনেমার দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেই দেশগুলো থেকেই ভালো ভালো ছবি আসছে, যে দেশগুলোর বাজার সুরক্ষিত। ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে আমরা একের পর এক অসাধারণ সব ছবি পাচ্ছি। কারণ, তাদের ইন্ডাস্ট্রিটা হলিউড এখনো গিলে ফেলতে পারেনি। আর জাপানি বা ইউরোপের অন্যান্য দেশের দিকে তাকান। হলিউডের বিশাল পুঁজি আর বিপণনের তোড়জোড়ে তাদের নিজস্ব ইন্ডাস্ট্রি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। আমাদের ক্ষেত্রে বলিউডই হলিউডস্বরূপ। তাই ভারতীয় ছবি আমদানির আগে সবকিছু মাথায় রাখতে হবে। হিন্দি ছবির আগ্রাসন কেবল বাংলাদেশি ছবির জন্যই বিপজ্জনক, তা নয়। এটা সামগ্রিকভাবেই বাংলা ভাষা সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
 
সরকার
যদি একান্তই মনে করে, বাংলাদেশের মানুষকে বড়পর্দায় বিদেশের ভালো ছবি দেখাবে, তাহলে বিভাগীয় শহরগুলোতে একটা করে হল নির্দিষ্ট করে দিতে পারে, যেখানে বিদেশি ভালো ছবি দেখানো হবে। তবে সেটা কোনোভাবেই কেবল হিন্দি নয়। লাতিন, ষ্পেনিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইরানি, কোরিয়ানসব ছবিই আনুপাতিক হারে দেখাতে হবে।

মোরশেদুল
ইসলাম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা: চলচ্চিত্র নির্মাতা।