Tuesday, February 9, 2010

বিশ্বাস হচ্ছে না, স্বপ্ন দেখছি না তো!

সবারই চোখ ছিল প্রমীলা প্রিয়দর্শিনীর দিকে। শ্রীলঙ্কান সাংবাদিকরা তো আগ বাড়িয়ে বলেই দিয়েছিলেন প্রমীলাই হতে যাচ্ছেন দক্ষিণ এশিয়ার দ্রততম মানবী। কিন্তু যাকে নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাস ছিল না সেই নাসিম হামিদই চমকে দিলেন! এক পলকে পেছন ফেললেন অন্যদের। ১১.৮১ সেকেন্ডে যখন শেষ করলেন ল্যাপ, তখন নিজেই বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলছিলেন, ‘তাহলে আমিই দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানবী? বিশ্বাস হচ্ছে না, স্বপ্ন দেখছি না তো?’

পাকিস্তানের করাচির ২৩ বছর বয়সী নাসিম তাইতো ল্যাপ শেষ করেই ট্র্যাকে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। সবার আগে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কেননা, তিনি এমন এক পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন যেখানে মেয়েদের খেলাধুলায় আসা বিরল উদাহরণ। তারপরও এসেছেন! আর বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রতিভা আগুনের মতো, তা কখনো চাপা দিয়ে রাখা যায় না। তবে পাকিস্তান আর্মিতে চাকরি করা এই তরুণী কি সত্যিই ভেবেছিলেন ঢাকায় এতো বড় চমক অপেক্ষা করছে? ‘মিথ্যে বলব না, অন্যরা যাই ভাবুক আমি কিন্তু স্বর্ণপদক জেতার জন্যই ট্র্যাকে নেমেছিলাম।’ কিন্তু অন্য প্রতিযোগীদের পাশে গতকাল সাদামাটাই লাগছিল নাসিম হামিদকে। উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ২ ইঞ্চি।

কিন্তু সেই উচ্চতা কোনোরকম বাধাই হতে পারল না।তবে নাসিম হামিদ বলছিলেন তার এই ২৩ বছরের চলা পথটুকু এমন প্রশস্ত ছিল না। প্রতি মুহূর্তে লড়াই করে তবেই উঠে আসতে হয়েছে তাকে। এমনিতে পাকিস্তানে মেয়েদের খেলাধুলা বেশ পিছিয়ে। তালেবান উত্পাতের কারণে এখন আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ছাড়া অনুশীলনের সুযোগ ছিল না নাসিম হামিদের। এসএ গেমসের দুই মাস আগে ইসলামাবাদ স্পোর্টস কমপ্লেক্সে অনুশীলন শুরু করেন। এর মধ্যে পাকিস্তান জাতীয় অ্যাথলেটিক্সের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের স্বর্ণপদক জিতে নিজেকে চিনিয়ে দেন। তবে কোচ মাকসুদ আহমেদ শুরুতেই বুঝেছিলেন এই মেয়ে অনেকদূর যাবে, ‘আসলে ট্রেনিংয়ে ওকে দেখেই বুঝতে পারি ও হারিয়ে যাবে না।’নাসিম হামিদ যে হারিয়ে যাননি তার প্রমাণ তো গতকাল বিকালের ইতিহাস।

হ্যাঁ, এটা ইতিহাসই। এই প্রথম পাকিস্তানের কোনো মেয়ে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের দ্রুততম মানবী হলেন! ব্যাপারটা আরও বেশি উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে তাকে। বলছিলেন, ‘আমি পথ দেখালাম। এবার আশা করছি পাকিস্তান থেকে আরও অনেক মেয়ে উঠে আসবে। এসএ গেমসই শুধু নয়, কমনওয়েলথ গেমসেও বাজবে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত।’

গতকাল নাসিম হামিদের পরই ছিলেন প্রমীলা প্রিয়দর্শিনী। তিনি সময় নিয়েছেন ১১.৯৩ সেকেন্ড। ব্রোঞ্জ একই দেশের আচালা ডিয়াসের (১২.১২)। পাকিস্তানি নাসিম হামিদের দিনে হতাশ করেছেন বাংলাদেশের সামসুন্নাহার চুমকি। ১২.১৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্রুততম মানবীর লড়াইয়ে পাঁচ নম্বর আমাদেরও দেশসেরা স্প্রিন্টার।

যদি বোল্টের মতো ঝড় তুলতে পারতাম!

যেন আগে থেকেই তার চিত্রনাট্য জানা ছিল! জানতেন ১০০ মিটারের ওই স্প্রিন্ট সবার আগে তিনিই শেষ করবেন! তাইতো দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানব হয়েও মাটিতেই পা ছিল শেহান শেরওয়ান আবেপিতিয়ার। ভারতের কুরেশমিদ আবদুল নাজিবকে পেছনে ফেলে গেমসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পদকটি জেতার পর এই শ্রীলঙ্কান বলছিলেন, ‘আহ! যা চেয়েছিলাম তাই হলো! ট্র্যাকে পা দিয়েই নিজেকে নিজে বলেছিলাম—স্বর্ণ পদক চাই!’ শেহানকে এতোটা উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে না গেলেও বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্স থেকে নেমে এলেন দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রী গামিনি লোকোগে। জড়িয়ে ধরলেন শ্রীলঙ্কার গর্ব দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্রুততম মানবকে। ততক্ষণে যেন শেহান বুঝতে পারলেন ১০.৪৬ সেকেন্ডে কী করেছেন তিনি!
এবারের এসএ গেমসের ২০০ মিটার স্প্রিন্টেই অবশ্য নিজেকে চিনিয়েছিলেন কলম্বোর ২০ বছর বয়সী এই তরুণ। ওই ইভেন্টে একটুর জন্য হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল স্বর্ণপদক। যার কাছে হেরেছিলেন সেই ভারতের আবদুল নাজিবকে (১০.৫৬ সেকেন্ড) গতকাল বুঝিয়ে দিলেন ওটা আসলে ছিল নিছকই অঘটন।
যদিও তার প্রিয় ইভেন্ট কিন্তু ১০০ মিটার সিপ্রন্টই। এই গ্রহের দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টকে আদর্শ মানেন বলেই নাম লেখান ২০০ মিটার স্প্রিন্টে। জ্যামাইকান ওই গ্রেটের মতো ডাবল জেতার স্বপ্ন তাকে বিভোর করে রাখে সব সময়—‘মিথ্যে বলব না, উসাইন বোল্টকে অনুসরণ করি বলেই ১০০ মিটারের পাশাপাশি ২০০ মিটারেও নাম লেখাই। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে দ্রুততম মানবের লড়াইয়ে। যখনই ওর ৯.৫৮ সেকেন্ডে করা বিশ্বরেকর্ড দেখি, অবাক হয়ে যাই! যদি এভাবে গতির ঝড় তুলতে পারতাম।’
দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানবের সঙ্গে অবশ্য এখনও কথা হয়নি উসাইন বোল্টের। তবে গত বছর জার্মানিতে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে দূর থেকে দেখেছেন স্বপ্নের তারকাকে। তার সেই রেকর্ড ছোঁয়ার স্বপ্ন কী দেখেন? প্রশ্নটার জবাব দিতে গিয়ে কিছুটা সময় নিলেন শেহান। একটু দম নিয়ে বললেন, ‘তাকে টপকে যাওয়া কি সম্ভব? মনে হয় না। বোল্ট সর্বকালের সেরা। আপনারা হয়তো হাসবেন, কিন্তু আমি মাঝে মধ্যে ঠিকই স্বপ্ন দেখি ওকে টপকে যাচ্ছি। আসলে স্বপ্ন দেখতে সমস্যা কোথায়? আমি মাত্র এ লেভেল পরীক্ষা দিয়েছি। আমার হাতে তো অনেক সময় আছে!’
জ্যামাইকান ওই কিংবদন্তিকে টপকে যেতে পারবেন কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে শ্রীলঙ্কান অ্যাথলেটিক্স যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সেটা আরও একবার প্রমাণ হলো। প্রমাণ হলো ২ কোটি জনসংখ্যার দেশটি একশ’ কোটিরও বেশি মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করা ভারতকে পেছনে ফেলছে! এমন সাফল্যের রহস্যটা কি? ‘দেখুন শ্রীলঙ্কার চার দিকই সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। সমুদ্রের আশপাশে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো এমনিতেই অ্যাথলিট। কিছু সামুদ্রিক মাছ আমাদের বাড়তি স্ট্যামিনা এনে দেয়। আমাদের মাসলগুলো মজবুত হয়ে ওঠে আরও’—বলছিলেন এবারের গেমসের দ্রুততম মানব শেহান শেরওয়ান আবেপিতা।
১০০ মিটার স্প্রিন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছেন কাল পাকিস্তানের লিয়াকত আলী। সময় নিয়েছেন ১০.৫৬ সেকেন্ড। নিশ্চয়ই এবার জানতে চাইছেন বাংলাদেশের প্রতিযোগী কী করল?প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে পারলেই ভালো হতো। কেননা ৮ জনের মধ্যে অষ্টম হয়েছেন মাসুদুল করিম।

Monday, February 8, 2010

আফগানি বেলালের নরওয়ে পাড়ি জমানোর গল্প

দুর্দান্ত স্কিল আর দুরন্ত গতি অন্যদের চেয়ে তাকে আলাদা করে দেয়! উচ্চতায় তেমন আহমরি নন। তারপরও মাঠের ওই ২২ ফুটবলারের মধ্যে তাকে চিনে নিতে সমস্যা হয় না। আসলে পারফরমেন্সই তাকে ৯০ মিনিটের খেলায় বারবারই নিয়ে আসে আলোচনায়। যেমনটা হচ্ছে এসএ গেমস ফুটবলে। এরই মধ্যে নিজেকে চিনিয়েছেন বেলাল আরজু। নরওয়ের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব আসকের হয়ে খেলা আফগানিস্তানের এই স্ট্রাইকার প্রতি ম্যাচেই পেয়েছেন গোল।
ভারতের বিপক্ষে গোল দিয়ে শুরু। প্রথম ম্যাচে তার দেয়া ওই গোলেই জেতে আফগান ফুটবল দল। এরপর গেমসের ফুটবলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানের বিপক্ষে আবারও ম্যাজিক। এবার করেন দুই গোল। গ্রুপ পর্যায়ের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আফগানরা জেতে ২-০ গোলে। এখানেও দু্ই গোল তার। এরপর সেমিফাইনালেও সেই বেলালই ত্রাণকর্তা। তার গোলেই মালদ্বীপকে হারিয়ে আফগানিস্তান উঠে গেছে গেমসের ফাইনালে।
আজ বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের বড় পরীক্ষা। ৪ ম্যাচে ৬ গোল করা এই স্ট্রাইকার গতকাল বলছিলেন, ‘না, আমার গোলক্ষুধা মেটেনি! বাংলাদেশের বিপক্ষে ফাইনালেও ঝড় তুলতে চাই।’তাহলে ফাইনালে আফগানিস্তানকেই এগিয়ে রাখছেন? অবশ্যই! মাতৃভূমি বলে কথা। তবে বাংলাদেশও ভালো দল। আশা করছি স্বর্ণপদকের লড়াই বেশ জমে উঠবে।
লড়াই জমে উঠবে কিনা সেটা সময়েই জানাবে। কিন্তু আপনি যে এবারের সেরা ফুটবলার সেটা প্রায় নিশ্চিত...
আসলে আমি ঠিক এভাবে দেখছি না। দেখুন যদি আফগানিস্তান চ্যাম্পিয়ন হতে না পারে তাহলে সেরা খেলোয়াড় হয়েও স্বস্তি পাব না। আসলে আমার এই যে পারফরমেন্স, ধারাবাহিকভাবে গোল করে যাওয়া তার কৃতিত্ব কিন্তু সতীর্থদেরই। তাছাড়া আমাদের অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচ ইলিয়াস আহমেদ মাচোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন! এ কারণেই আমি সবসময় মনে করি এটা আমার একার নয়, সবার সাফল্য।
দলের প্রসঙ্গ থাক, আফগানিস্তান থেকে আপনার নরওয়েতে পাড়ি জমানোর গল্পটা শুনতে চাই?
আহ! এটা অনেক লম্বা গল্প! ছোট করে যদি বলতে যাই তাহলে বলতে হয়, আমার বাবা আফগানিস্তানের রাজনীতিবিদ। আর এটাই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়! আমার বয়স যখন ৩ বছর, তখন ছাড়তে হয় আফগানিস্তান। দেশ থেকে একরকম তাড়িয়েই দেয়া হয় আমাদের। সেটা রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, যা এ মুহূর্তে বলতে চাই না। আফগানিস্তান ছেড়ে প্রথমে আমরা মানে আমাদের পরিবারের মানুষরা আশ্রয় নেই পাশের দেশ পাকিস্তানে। এরপর সেখান থেকে চলে যাই ইরানে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছি আমরা। আর সবশেষে বাবা-মা ৮ ভাইবোনকে নিয়ে এখন নরওয়েতে এসে স্থায়ী হয়েছি।
তাহলে আপনার শৈশব অনেকটা যাযাবরের মতো কেটেছে?
আসলে আমার শৈশবের স্মৃতি মনে করতে চাই না। দেশ ছেড়ে অন্যের দেশে থাকা যে কতটা কষ্টের সেটা যারা থাকছেন তারাই জানেন। পাকিস্তানের সময়গুলো দুঃসহ কেটেছে আমাদের। উদ্বাস্তু ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে আমাদের। সেখানে বন্ধু বলে কেউ ছিল না। ইরানেও দুবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে আমার বাবা ও বড় ভাইদের। এক সময় মনে হয়েছে আমাদের জন্মানোই যে পাপ!
এখন সময় তাহলে ভালো কাটছে?
আসলেই অনেক সুখে আছি এখন। যখন আমার আত্মীয়স্বজনদের দেখি তখন ভাগ্যবানই মনে হয়। আমাদের পরিবারের সবাই নরওয়ে পাড়ি জমালেও আত্মীয় অনেকেই এখন বেঁচে থাকার লড়াই করছেন আফগানিস্তানে। অসহায় ওই মানুষদের কথা যখন ভাবি তখন মন খারাপ হয়ে ওঠে। ওরা প্রতিটা মুহূর্ত মৃত্যুর ভয়ে কাটাচ্ছেন!
তাদের জন্য কি কিছু করছেন?
আমার সাধ্যমতো আমি সবাইকে সাহায্য করছি। আল্লাহ সামর্থ্য দিলে অবশ্যই আরও বেশি কিছু করব। এটা ঠিক ইউরোপে শান্তিতে আছি। কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাবি সত্যিই কি সুখে আছি? যুদ্ধ কি কারণে হয়েছে কিংবা হচ্ছে জানি না। কিন্তু আমি মনে করি এখন শান্তি দরকার।
নরওয়ের ক্লাবে খেলছেন। সেখানকার জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব এলে কি করবেন?
প্রস্তাব কিন্তু এসেছিল। অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু আমার লক্ষ্য আসলে আফগানিস্তানের হয়ে খেলা। হ্যাঁ, এটা ঠিক নরওয়ের নাগরিত্ব নিয়েছি। কিন্তু ভবিষ্যতেও এমন প্রস্তাব এলে না করব। আমি একজন আফগান হিসেবে গর্বিত!
ইউরোপে খেলছেন, আপনার হিসাবে কারা এগিয়ে লাতিন ফুটবল নাকি ইউরোপিয়ান ফুটবল?
আমি তো বলব ইউরোপিয়ান ফুটবলই এগিয়ে। দেখুন সেখানে প্রতিযোগিতা কত কঠিন। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকায় দুটো দেশই রাজত্ব করছে।
সেই দুই দেশের মধ্যে আপনার প্রিয় কোনটি—ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?
আমার প্রিয় অবশ্যই ব্রাজিল।
আর প্রিয় ফুটবলার?
ব্রাজিলের রোনালদিনহোর অন্ধভক্ত আমি। বলের ওপর ওর নিয়ন্ত্রণ দেখে ভাবি এমনটা যদি পারতাম!ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ভক্ত।
তাহলে নিশ্চয়ই সর্বকালের সেরা হিসেবে আপনার রায় যাবে পেলের পক্ষে?
আসলে আমি পেলে কিংবা ম্যারাডোনা কারও খেলাই সরাসরি দেখতে পারিনি। ভিডিওতে যতটুকু দেখিছি তাতে আমার মনে হয় ম্যারাডোনাই এগিয়ে। ম্যারাডোনাকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে খেলতে হয়েছে।

গতকাল হোটেল শেরাটনের লবিতে এভাবেই যখন গল্প জমে উঠছিল, তখনই বেলাল আরেজুর ডাক এলো। অনুশীলনে যেতে হবে। বাংলাদেশের বিপক্ষে স্বর্ণপদকের লড়াই! সেই লড়াইয়ের আগে শেষ অনুশীলন। যাওয়ার আগে ২১ বছর বয়সী এই ফুটবলার বলছিলেন, ‘আমরা ফুটবলপ্রেমী জাতি। আমি নিশ্চিত এখানে স্বর্ণপদক পেলে কিছু মানুষের মুখে হাসি ফুটবে! হাসতে যে ওরা ভুলেই গেছে!’

Sunday, February 7, 2010

স্বর্ণকন্যা রুমির সংগ্রামী জীবন

গল্পটা ঠিক আর দশটি পরিবারের মতো নয়! সেটা হলে তো আট ভাইবোনের সবচেয়ে ছোটটি সেই পঞ্চগড়ের আজিজনগরেই থাকত! আবদার আর আদরেই কাটত শৈশবের দিনগুলো। কিন্তু বেশি ভাইবোন থাকা পরিবারের আদুরে বোন হওয়া সম্ভব হয়নি শারমিন ফারজানা রুমির। জীবনের কঠিন বাস্তবতা যতটুকু থাকে, তারচেয়েও বেশি অতিক্রম করতে হয়েছে তাকে। তাইতো ‘না’ শব্দের অস্তিত্ব নেই তার অভিধানে! গতকাল সেই সংগ্রামের পুরস্কারও মিলল!
আফগানিস্তানের লায়লা হোসাঙ্গের হিসাব উল্টে দিয়ে তায়কোয়ান্দোর অনূর্ধ্ব-৪৬ কেজিতে স্বর্ণপদক জিতলেন বাংলাদেশের শারমিন ফারজানা রুমি। এবারের এসএ গেমসে হামিদুলের পর আবারও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) জিমন্যাসিয়ামে বেজে উঠল বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। উড়ল লাল-সবুজ পতাকা।
হিসাবের ছকে এ ইভেন্টে আফগানিস্তানের প্রতিযোগীই ছিল ফেভারিট। কিন্তু দিনটা ছিল বাংলাদেশের রুমির। নেপালের ইয়ান কুমারীকে হারানোর পরই বুঝতে পারেন আজ হবে! ‘মিথ্যে বলব না। আমার লক্ষ্য ছিল ভালো খেলা। কোনো পদক আসবে—এসব নিয়ে ভাবিনি। কিন্তু নেপালের প্রতিযোগীকে শুরুতেই যেভাবে হারালাম, তারপর মনে হলো আজ হবে’—বলছিলেন রুমি। আসলেই হলো। এরপর গতকাল বিকালে এনএসসি জিমন্যাসিয়ামে যা করতে চেয়েছেন, তাই হয়েছে। ৩ রাউন্ডের লড়াইয়ে আফগানিস্তানের লায়লার বিপক্ষে জিতেছেন ১৫-৪ পয়েন্টে। তবে যতটা সহজে বলা হয়ে গেল ১৫-৪ পয়েন্টে জিতেছেন, ঠিক ততটা সহজ ছিল না লড়াইটি। মার্শাল আর্টের খেলায় কাল দুপুর থেকেই অন্যান্য প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়তে হয়েছে তাকে। এরপরই মিলেছে স্বর্ণপদক। আসলে একদিনের পরিশ্রমেই কি ওই স্বর্ণ বাস্তবের ছোঁয়া পেল? না, বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার আজিজনগর গ্রামে জন্ম নেয়া মেয়েটির এই স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে। তখন শারমিন ফারজানা রুমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। পড়ছে স্থানীয় কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তখনই বাংলাদেশ আনসারের প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির কর্মকর্তাদের নজরে পড়ে রুমি। কিন্তু পরিবারের অনুমতি তখনও বাকি। রুমির বয়স যখন ৬, তখনই বাবা মারা যান। ৮ ভাইবোনের সেই সংসারের কর্তা তখন বড় ভাই। একজনের সংস্থান হলে সংসারের খরচ কমবে—এই ভেবে বড় ভাই অনুমতি দিয়ে দেন। শুরু হয় রুমির নতুন সংগ্রাম। পড়াশোনা এবং আনসারের হয়ে তায়কোয়ান্দো চর্চা।
প্রতিদিন ৫ ঘণ্টার বেশি অনুশীলন; এরপর পড়াশোনা—সব মিলিয়ে তার অন্যসব সতীর্থ যখন ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে কিংবা পালানোর পরিকল্পনা করছে, তখন রুমি ছিলেন অন্যরকম। আসলে তা না থেকেও উপায় ছিল না। তাকে যে মানিয়ে নিতেই হবে। তাতে অন্তত সংসারে কিছুটা হলেও যে চাপ কমে! এভাবেই একসময় পাস করেন এসএসসি। আর তাতে পায়ের নিচের মাটি শক্ত হতে থাকে।এসএ গেমসের জন্য অনুশীলন করেছেন গত ১৪ মাস ধরে। চাইনিজ কোচ লি জু চাংয়ের প্রিয় ছাত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন রুমি। কেননা, অন্যরা অনুশীলনে ফাঁকি দিলেও রুমি সময় দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। যেমনটা বলছিলেন—‘আসলে কখনই আমি ফাঁকি দেয়ার পক্ষপাতী ছিলাম না। কেননা এটা তো নিজেকে নিজেই ফাঁকি দেয়া! এগিয়ে যেতে হলে আমাকে তো পরিশ্রম করতেই হবে।’ পরিশ্রমের এই স্বীকৃতির পর ২০ বছর বয়সী রুমি বলছিলেন—‘এখানেই থেমে যেতে চাই না আমি। আমার লক্ষ্য থাকবে এখন এশিয়ান অন্য গেমসগুলো। সেখানেও ভালো করতে চাই।’এটা তো গেল দেশের জন্য কিছু করার কথা। স্বর্ণ এনে দেয়ার পর নিজেকে নিয়ে কি ভাবছেন তিনি?
না, এখানেও ব্যতিক্রম তেঁতুলিয়ার এই তরুণী। অন্যরা যখন সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলেন, সেখানে আনসার থেকে মাসে চার হাজার টাকা বেতন পাওয়া শারমিন ফারজানা রুমি বলছিলেন—‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। অনেক কিছু পাচ্ছি। শুধু আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।’কিছু মানুষ আছেন যারা নীরবে শুধু দিয়ে যেতেই জানেন। স্বর্ণকন্যা রুমি সেই তাদেরই একজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রতিভার মূল্যায়ন না হলে তা আর কতদিন টেকে?

Friday, February 5, 2010

টাকা বাঁচাতে..

পাড়া-মহল্লার খেলাধুলায় এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু এসএ গেমসের মতো এতো বড় মাপের আসরেও এমন ঘটনা ঘটবে ভাবেনি কেউ! গতকাল মহিলা ফুটবলের ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল শ্রীলঙ্কান ফুটবল দলের। কিন্তু সকালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে সেই ম্যাচ না খেলে দেশে ফিরে গেছে তারা। অ্যাথলেটিক্সসহ বেশ কয়েকটি ইভেন্টের জন্য কালই যে চার্টার বিমানে লঙ্কান অ্যাথলিটরা ঢাকা আসেন তাতে করেই বাংলাদেশ ছেড়েছেন তারা।
আসলে এমনিতেই প্রথম দুটো ম্যাচ হেরে বিপাকে পড়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। কাল সকালের ম্যাচটি অনেকটা দায়সারার ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। জিতলেও পদক জেতার লড়াইয়ে ফেরা হতো না। প্রথম ম্যাচে তারা নেপালের কাছে হেরেছিল ০-৮ গোলে। পরের ম্যাচে বাংলাদেশ তাদের হারিয়েছিল ২-০ গোলে। তাই শেষ ম্যাচে জিতলেও এই ইভেন্ট থেকে তাদের পদকের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তাই সময়ের সঙ্গে টাকাকড়ির খরচ বাঁচাতে গতকালই ঢাকা ছেড়েছেন তারা। কাল দলের একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, টাকা বাঁচাতেই ওই ম্যাচ না খেলে চলে গেছে তারা। এমনিতে নিয়ম অনুয়াযী ইভেন্ট শেষ হওয়ার একদিন পর থেকেই আয়োজকদের পক্ষ থেকে খরচ বন্ধ করে দেয়া হয়।
তখন থাকতে গেলে নিজেদের খরচেই থাকতে হয়। এ অবস্থায় ফ্লাইট জটিলতার কথা ভেবে সেই বিমানেই দেশে ফিরে গেছে লঙ্কান মহিলা ফুটবল দল।একেবারে সাদা চোখে দেখলে হয়তো বিষয়টাকে খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু অলিম্পিক স্পিরিটের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শ্রীলঙ্কান দলের এমন চলে যাওয়াটাকে ভালো চোখে দেখছে না দেশটির মিডিয়া। —শুধ কি টাকা বাঁচাতে এমন সিদ্ধান্ত? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে ১১তম এসএ গেমসের শ্রীলঙ্কান দলের অন্যতম সমন্বয়কারী রিসাল লতিফকে। তিনি বলছিলেন, ‘আসলে এছাড়া অন্য কিছু করার ছিল না আমাদের। দেশ থেকে আমাদের অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হেমসে ফার্নান্ডো স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে ম্যাচ খেলেও লাভ নেই তা খেলার দরকার কি। তাছাড়া এই বিমানে না আসলে তো ১০ ফ্রেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হবে। এতোদিন থেকে বাড়তি অর্থ খরচের কোনো মানে নেই!’ রিসাল লতিফ জানালেন, কলম্বো থেকে ওই বার্তা আসার পর ম্যাচ না খেলেই তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।তবে পাকিস্তানকে গতকাল ওয়াকওভার দেয়ার আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে নাকি কথা বলেছে শ্রীলঙ্কান দল। পরিস্থিতি পুরোটা জানিয়ে তবেই দেশ ছেড়েছে।
তারা ছাড়াও সেই চার্টার বিমানে ঢাকা ছেড়েছে শ্রীলঙ্কান ওয়েটলিফটিং, সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন এবং কাবাডি দল। এসেছে অ্যাথলেটিক্স, সুইমিং, বক্সিং, কারাতে, রেসলিং এবং টেবিল টেনিস দল। যদিও গতকাল এসএ গেমস টেকনিক্যাল উপকমিটির সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু বলছিলেন— ম্যাচ না খেলে শ্রীলঙ্কান মহিলা দলের চলে যাওয়া সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। তবে তিনি এটা নিশ্চিত করেছেন, এ নিয়ে ফুটবল ফেডারেশন শিগগিরই তদন্ত কমিটি গঠন করবে। ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এফএসি)। এটা পুরোপুরি এএফসির ব্যাপার। এক্ষেত্রে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হতে পারে লঙ্কান মহিলা ফুটবল দলকে। তবে এসবই এখন কেবল প্রাথমিক অনুমান। তদন্ত রিপোর্ট দেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু।
বাংলাদেশে যে কোনো ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠনটা হয় খুব জোরেশোরে। সেই কমিটি আবার বেশ কিছুদিন হাঁকডাকও করে। কিন্তু এমন সব তদন্তের কয়টির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেছে, সেই প্রশ্নে কর্তাদের কাছে মিলল মুচকি হাসি!

Thursday, February 4, 2010

‘আফগানিস্তান আর মৃত্যুপুরী নয়, পৃথিবীর সেরা দেশ’

কিছু কমন প্রশ্ন এতো বেশি শুনতে হচ্ছে যে বিরক্তি ধরে গেছে! তাই কথা বলার শুরুতেই মোহাম্মদ মোস্তফা কামান্দ স্পষ্ট জানিয়ে রাখলেন, ‘দয়া করে যুদ্ধ, তালেবান কিংবা ওসামা বিন লাদেন—এসব নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। অনেক হয়েছে, এবার আমরা আফগানরা দৃষ্টি ফেরাতে চাই অন্যদিকে।’ আসলেই তো অনেক হয়েছে। সেই ১৭৪৭ সালে আহমেদ শাহ দুরানি দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ার দেশটিকে নতুন সাম্রাজ্য ঘোষণার পর থেকেই চলছে অস্থিরতা। এরপর ১৯১৯ সালের অপয়া ১৯ আগস্টে শুরু ‘দ্য গ্রেট গেম’ বলে পরিচিতি পাওয়া তৃতীয় আংলো-আফগানিস্তান যুদ্ধ। ব্রিটিশ-সোভিয়েতের সেই যুদ্ধে গিনিপিক হতে হয়েছে সাধারণ আফগানদের। ’৭০-এর আলোচিত সিভিল ওয়ারের পর এখন চলছে মার্কিন মিত্র শক্তির তালেবান দমনের নামে ‘শান্তি মিশন’। ২০০১ থেকেই যুদ্ধের দাবানলে পুড়ছে দেশ।
যুদ্ধের মধ্যেই বেড়ে ওঠা আফগানিস্তানের এই প্রজন্ম সত্যিই হাঁপিয়ে উঠেছে! তাইতো এবারের এসএ গেমসে ৭৭ কেজি ভারোত্তোলনে ব্রোঞ্জজয়ী আফগান নাগরিক মোস্তফা কারমান্দ বলছিলেন, ‘এখন প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে আমাদের দেশের চেহারা। যুদ্ধ শেষ। আমরা ফুটবল খেলার মাঠ কিংবা ভারোত্তোলনের জিমন্যাসিয়াম সবকিছু আবার বুঝে পেয়েছি। শুধু কাবুল নয়, এখন পুরো দেশ থেকেই ক্রীড়াবিদরা উঠে আসছেন।’ যদিও এই মোস্তফা কারমান্দের চলার পথে আর দশজন আফগানের মতো কাঁটা বিছানো ছিল না। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের ধনী এক পরিবারে জন্ম তার। বাবা রহমুতুল্লাহ কারমান্দও একসময় ভারোত্তোলক ছিলেন। অলিম্পিক গেমসে প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশের। এখন আফগান ওয়েটলিফটিং ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট। বাবাকে দেখেই ভারোত্তোলনে নাম লেখান মোস্তফা। অবশ্য তাদের পরিবারের অন্য দু’ভাইও ভারোত্তোলক। যার মধ্যে একজন এখন খেলা ছেড়ে কাজ করছেন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে। অন্যজন পাড়ি জমিয়েছেন মার্কিন মুল্লুকে।
কিন্তু মোস্তফা কারমান্দের অন্য দেশে পাড়ি জমানোর ইচ্ছে নেই। খেলাধুলার বাইরে পড়াশোনা নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হয় কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার এন্ড সায়েন্সে পড়া এই তরুণকে। জানালেন, লক্ষ্য আছে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ভারোত্তোলক হওয়ার—‘দেখুন আমি কি করতে পারবো সেটা না ভেবে পরিশ্রম করে যেতে চাই। যদি লক্ষ্যের কথা বলেন তবে বলব, দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হতে চাই আমি। এরপর যখন বয়সে কুলোবে না তখন দেশের সেবা করতে চাই।’
২০ বছর বয়সী এই তরুণের মতো এতোটা ভাগ্যবান নন এসএ গেমসে আফগান দলের আরেক ভারোত্তোলক মারওয়ান বিমার। তার জন্ম এমন এক জায়গায় যার নাম শুনলে ওসামা বিন লাদেনের কথা মনে পড়ে সবার। একসময়ের তালেবান নিয়ন্ত্রিত কান্দাহারে জন্ম মারওয়ান বিমারের। তিনি বলেন, এখন আসলেই পাল্টে যাচ্ছে আফগানিস্তানের চেহারা। এটি আর মৃত্যুপুরী নেই—‘মিথ্যে বলছি না, আমরা আফগানিস্তানে সত্যিই ভালো আছি। আবার শান্তি ফিরে এসেছে আমাদের দেশে। যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর আমাদের এই প্রজন্ম ক্রীড়ামুখী হয়ে উঠেছে। আসলে টেলিভিশনে অনেক কিছু দেখে আমাদের দেশ সম্পর্কে বাইরের বিশ্ব কিছুই বুঝতে পারছে না। ভুল তথ্য যাচ্ছে সবার কাছে। দেখুন, গত বছর বডি বিল্ডিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে হেলমন্দ নামের এক অচেনা এলাকার বাসিন্দা। গ্রামের মানুষও সব ভুলে মাঠে ফিরছে!’ তিন আরও জানালেন, দেশটিতে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা রেসলিং, সঙ্গে তায়কোয়ান্দো, ফুটবল, জুডো, ভারোত্তোলন; বাস্কেটবলেও আগ্রহ বাড়ছে। তবে এভাবে এগিয়ে যেতে পারলে কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো তারা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তি হবে—এমন দাবি মারওয়ান বিমারের।
ভবিষ্যতে কি হবে সেটা বলার সাধ্য অবশ্য কারো নেই। সেটা যাই হোক, যুদ্ধ কাটিয়ে দেশে শান্তিতো ফিরেছে, তাতেই খুশি আফগান ক্রীড়াদিরা। দলের ভারোত্তোলন কোচ মোহাম্মেদ আজম বলছিলেন, ‘আমার এই জীবনে অনেক কিছুই দেখেছি। এতো ভালো পরিবেশ আফগানিস্তানে আর আসেনি। বেশ শান্তিতে আছি! আপনাদেরকে বলছি—আমাদের দেশে এসে দেখুন, দেশটা কতো সুন্দর। আমি নিশ্চিত, মানুষগুলোর আতিথেয়তা মুগ্ধ করবে আপনাদের।’ এখানেই থামলেন না ষাটোর্ধ্ব এই কোচ। সঙ্গে যোগ করলেন, ‘আমি আমার দেশ নিয়ে সত্যিই অনেক গর্বিত! অনেক প্রলোভন এসেছিল দেশ ছেড়ে পালানোর। কিন্তু পালাইনি। এটাই পৃথিবীর সেরা দেশ, এটা ছেড়ে যাব কোথায়? এখানেই জন্ম আর এই দেশেই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত থাকতে চাই।’
এমন দেশপ্রেম যারা ধারণ করেন তারাই আসলে পারেন ফিনিক্স পাখির মতো ধংসস্তূপ থেকে জেগে উঠতে!

Tuesday, February 2, 2010

মনোরঞ্জনের দাবি— স্বর্ণপদক তার!

রৌপ্যপদক জেতার পর সেটা গ্রহণ করার জন্য মঞ্চেই আসতে চাননি মনোরঞ্জন রায়। কেননা এভাবে হার মেনে নিতে হবে ভাবেননি বাংলাদেশের এই ভারোত্তোলক। গতকাল পুরুষদের ৭৭ কেজি ভারোত্তোলনে রৌপ্যজয়ী ক্ষুব্ধ মনোরঞ্জন বলছিলেন, ‘আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আসলে হামিদুল নয়, আমিই এই ইভেন্টের স্বর্ণপদক জিততাম। স্বর্ণপদক আমার! কিন্তু আমাকে সেই পদক জেতার সুযোগ দেয়া হয়নি। আমি চেয়েছিলাম ক্লিন অ্যান্ড জার্ক রাউন্ডেও হামিদুলকে টপকে যেতে। কিন্তু আমি বৈষম্যের শিকার। ওরা সুযোগটা আমাকে দিল না। বললো তোমার স্বর্ণপদকের দরকার নেই!’
গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ জিমন্যাশিয়ামে তাইতো চোখের পানি মুছতে মুছতে সাংবাদিকদের সামনে এলেন সেনাবাহিনীর এই সদস্য। ৭৭ কেজি ইভেন্টের স্ন্যাচ রাউন্ডে হামিদুলের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন তিনিই। তুলেছিলেন ১২০ কেজি। উল্টোদিকে হামিদুল তোলেন ১১৭ কেজি। পরে ক্লিন ও জার্ক রাউন্ডেও হামিদুলের সঙ্গে সমান তালে লড়তে থাকেন তিনি। মনোরঞ্জনের ১৩৫ কেজির জবাবে এসে ১৪০ কেজি তুলে আটকে যান হামিদুল ইসলাম। পরে সেটা অতিক্রম করার সুযোগ এসে যায় মনোরঞ্জনের। সেই চ্যালেঞ্জটা নিতেও চেয়েছিলেন এই তরুণ। কিন্তু হামিদুল ও ভারোত্তোলন ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে নাকি সেটা পারেননি তিনি, ‘দেখুন আমি চেয়েছিলাম চ্যালেঞ্জটা নিতে। কিন্তু ড্রেসিংরুমে হামিদুল চিত্কার করে আমাকে বলেন তুমি থাম এবার। অন্য কর্মকর্তারা বলতে থাকেন তোমার দরকার নেই আর ওজন বাড়ানোর। অনেক হয়েছে! হামিদুল সিনিয়র, স্বর্ণপদক তার জন্য।’
এখানেই থামলেন না ২০ বছর বয়সী এই তরুণ। সঙ্গে যোগ করলেন, ‘আমার মন খারাপ এ কারণে যে, স্বর্ণপদক জেতার এমন সুযোগ বারবার আসে না। দেখুন এখানে ভারত ও পাকিস্তান ছিল না। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারতাম আমি। কিন্তু আমাকে পারফরম করতে দেয়া হলো না।’
তারপরও রৌপ্যপদক তো এসেছে! সেটাও কম কী? মনোরঞ্জন রায় বলছিলেন, ‘যা কিছুই হোক এটা অবশ্যই আমার জন্য স্মরণীয় একদিন। আজ মা বেঁচে থাকলে হয়তো অনেক খুশি হতেন। আমার এই পদক আর কারও জন্য নয়, এটি শুধুই আমার স্বর্গীয় মায়ের জন্য!’

বাংলাদেশকে প্রথম স্বর্ণ উপহার দিলেন হামিদুল

ভারোত্তোলনের ৭৭ কেজি ইভেন্টে পদক আসছে, এটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আগেই। প্রতিযোগী যখন তিনজন, তখন তো প্রতিযোগিতার মঞ্চে পা দেয়ার আগেই পদক নিশ্চিত! সেই তিনজনের মধ্যে আবার দুজনই বাংলাদেশের। অন্যজন আফগানিস্তানের। তাই লড়াই ছিল স্বর্ণের। সেই লড়াইয়ে আফগানিস্তানের মোস্তফা কামান্দ পিছিয়ে পড়ার পর স্বর্ণের লড়াই শুরু হয় দুই বাংলাদেশী ভারোত্তোলকের। স্ন্যাচ এবং ক্লিন জার্কের সেই লড়াই বেশ জমে উঠেছিল স্বদেশি হামিদুল ইসলাম এবং মনোরঞ্জন রায়ের। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল বুঝি ছোট ভাই একরামুলের পথ ধরে রৌপ্য পেতে যাচ্ছেন হামিদুল। কিন্তু ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে গেলেন বড় ভাই হামিদুল। দেশসেরা ভারোত্তোলক হামিদুলই জিতলেন স্বর্ণপদক। ১১তম এসএ গেমসে স্বাগতিকদের এটাই প্রথম স্বর্ণ জয়। চতুর্থ দিনে এসে গতকাল গেমস আঙিনায় বাজলো বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উডেনফ্লোর জিমন্যাশিয়ামে উড়লো বাংলাদেশের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা। গলায় স্বর্ণপদক ঝুলিয়ে পতাকা হাতে উচ্ছ্বাসে ভাসলেন হামিদুল।

এটা বাংলাদেশের জন্য যেমন এবারের গেমসে প্রথম স্বর্ণ তেমনি হামিদুলের এসএ গেমস ক্যারিয়ারেও প্রথম স্বর্ণ। এর আগে ইসলামাবাদ গেমসে রৌপ্য এবং কলম্বোতে পেয়েছেন ব্রোঞ্জ। তখন অবশ্য তার ইভেন্টেও ছিল ভিন্ন। ৬২ কেজি ইভেন্টে লড়েছেন। কিন্তু এবার ওজন বাড়িয়ে ৭৭ কেজিতে নাম লেখান হামিদুল। তাতেই বাজিমাত! এই স্বর্ণপদক জেতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাবেন ৫ লাখ টাকা।গতকাল স্ন্যাচ রাউন্ডে তোলেন হামিদুল তোলেন সর্বোচ্চ ১১৭ কেজি। এখানে অবশ্য এগিয়েছিলেন বাংলাদেশের আরেক প্রতিযোগী মনোরঞ্জন রায়। ১২০ কেজি তুলে হামিদুলের চেয়ে এগিয়ে যান তিনি।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের মোহাম্মদ মোস্তফা কামান্দ পিছিয়ে ছিলেন বেশ খানিকটা। ৯০ কেজি তুলেই হাঁপিয়ে যান যুদ্ধবিধস্ত দেশটির ভারোত্তোলক। ব্রোঞ্জেই সন্তুষ্ট তিনি। ক্লিন ও জার্ক পর্বে এমনিতেই সেরা হামিদুল। মনে হচ্ছিল এখানে তার কাছে পাত্তা পাবেন না অন্য দুই প্রতিযোগী। আফগান তরুণ ১১০ কেজি তুলে থেমে গেলেও বেশ জমে ওঠে হামিদুল এবং মনোরঞ্জনের লড়াই। দুজন যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল বুঝি সাফ রেকর্ড না আবার হয়ে যায়। কিন্তু এখানে স্ন্যাচ রাউন্ডের ব্যবধানটুকু কমিয়ে আনেন হামিদুল। তিনি তোলেন ১৪০ কেজি। মনোরঞ্জন থামেন ১৩৫-এ। দুই রাউন্ডে ২৫৭ কেজি তুলে দেশকে এবারের গেমসের প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেন হামিদুল। রৌপ্য জিতেন মনোরঞ্জন।

যদিও সেনাবাহিনীর এই সদস্য বলছিলেন ২৫৭ কেজি টপকে যাওয়ার সামর্থ্য আছে তার। কিন্তু তাকে সেই চ্যালেঞ্জ কাজে লাগাতে দেয়া হয়নি।প্রতিযোগিতায় ভারত-পাকিস্তানের ভারোত্তোলক ছিলেন না, তাতে স্বর্ণ জেতার কাজটা একটু সহজ হয়েছে হামিদুলের। কিন্তু পদকের আবেদন একটুও ম্লান হয়নি। তাইতো সেনাবাহিনীর সিএমটিটি শাখায় কর্মরত হামিদুল বলছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া! এমন একটি দিনের জন্যই আমি অপেক্ষা করেছি। সেই ১৯৯২ সালে ভারোত্তোলন শুরু করেছিলাম। অবশেষে স্বর্ণপদকের দেখা পেলাম। বলতে দ্বিধা নেই এটাই আমার ক্যারিয়ারের সেরা দিন!’ হামিদুলের এমন সাফল্যে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই। সাফে পদক ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে সেই ১৯৯৪ সাল থেকে এখন অবধি তিনিই ভারোত্তোলনের সেরা তারকা! তার হাত দিয়েই এবার স্বর্ণপদক এলো। এমন দিনে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন হামিদুল। ফিরে গেলেন সেই শৈশবে। জানালেন ফুটবল, ক্রিকেট, হকির মতো এতো খেলা থাকতে কেন ভারোত্তোলনে নাম লেখালেন, ‘আসলে ছোটবেলায় অন্য সবার মতো আমারও প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। কিন্তু আমাদের কুষ্টিয়ার গাংনির মোয়াজ্জেম ভাই আমার চিন্তা বদলে দিলেন। তিনি কিছুটা জোর করেই আমাকে ভর্তি করালেন তার জিমন্যাস্টিকস ক্লাবে। বললেন আমার মধ্যে নাকি ভারোত্তোলকের চেহারা দেখছেন। সেদিন হেসেছিলাম...। আজ মোয়াজ্জেম ভাইয়ের কথা অনেক মনে পড়ছে!’

এমনিতে হামিদুলকে অনুসরণ করে তার অন্য দুই ভাই একরামুল এবং আশরাফুলও ভারোত্তোলনে নাম লিখিয়েছেন। এরই মধ্যে এই গেমসে তার ছোটভাই একরামুল জিতেছেন রৌপ্যপদক। সব মিলিয়ে এখন সুখী মানুষদের একজনই হওয়ার কথা হামিদুলের। কিন্তু সামনের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ এই সুখী সময়েও তাকে চিন্তিত করে তুলছে, ‘দেখুন এখন হয়তো সংবর্ধনা পাব। কিছু টাকাও পাব। কিন্তু সময় ফুরালে সবাই ভুলে যাবে। অতীতে আমি এমনটাই দেখেছি। ভারোত্তোলনকে ক্রীড়াঙ্গনের বেশিরভাগই মানুষই গুরুত্ব দেয় না। সত্ভাইয়ের মতো মনে করে। হয়তো কিছুদিন পরই আমরা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ব।’ এই আশঙ্কা সত্য হলে আসলেই অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ অপেক্ষা করছে দেশকে স্বর্ণপদক এনে দেয়া এই ক্রীড়াবিদের জন্য, ‘আমার জীবনে সঞ্চয় বলে কিছু নেই। যা উপার্জন করি তার পুরোটাই এই শরীরের পেছনে ব্যয় করতে হয়। জানেন তো আমাদের অনেক নিয়ম মেনে পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়। সেসব জোগাড়ে যা উপার্জন করি তার পুরোটাই ব্যয় হয়ে যায়। প্রতিদিন এখন আমাদের দেয়া হয় ৩৭০ টাকা। আগে পেতাম মাত্র ১২০ টাকা! টাকার অংক দেখেই বুঝে নিন কি পাচ্ছি!’

যারা হামিদুলকে সংবর্ধনা দিয়ে স্বর্ণ জয়ের কৃতিত্বে ভাগ বসানোর অপেক্ষায় তারা কি এই দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাচ্ছেন?

Monday, February 1, 2010

নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েই খুশি একরামুল

নিজের সীমাবদ্ধতাটুকু ভালো করেই জানেন একরামুল। তাইতো উডেন ফ্লোর জিমন্যাসিয়ামের আট-দশজন দর্শক কিংবা কর্মকর্তাদের মতো আক্ষেপে পোড়েননি তিনি। একটুর জন্য স্বর্ণ পদক হাতছাড়া হয়ে গেলেও হাসতে হাসতেই রৌপ্যজয়ী এই ভারোত্তোলক বললেন, ‘গত কলম্বো এসএ গেমসে ব্রোঞ্জ পেয়েছিলাম, এবার রৌপ্য এলো! আমি খুশি। এভাবে এগিয়ে যেতে পারলেই হবে।’ নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেই খুশি একরামুল।
কিন্তু গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ওই উডেন ফ্লোর জিমন্যাসিয়ামে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ার পাশাপাশি জাতীয় সঙ্গীতও বাজতে পারতো! একটুর জন্য সেটা হলো না! ৫৬ কেজি পুরুষ ভারোত্তোলনে গতকাল শুরুটা দুর্দান্ত হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই তরুণের। স্ন্যাচ পর্বে এক পলকে তুলে নিয়েছিলেন ১০২ কেজি। উল্টোদিকে বাছাই পর্বেই বিদায় নেয় ভারতের ভারোত্তোলক। লড়াইয়ে বাংলাদেশের একরামুল হকের সঙ্গে টিকে থাকেন শ্রীলঙ্কার ওয়াতা আসে কামাল এবং পাকিস্তানের আবদুল্লাহ গফুর। কামাল তোলেন ৯৫ কেজি। আবার গফুর স্ন্যাচে উত্তোলন করেন ৯৭ কেজি। এখানে এগিয়ে যান বাংলাদেশের একরামুল।কিন্তু তখনও বাকি স্ন্যাচ ও ক্লিন রাউন্ড।
এখানে সেই এগিয়ে থাকাটা কাজে লাগানোর সুযোগ এসে যায় একরামুলের। প্রথম দফায় শুরুটাও বেশ ভালো হয় ২০ বছর বয়সী এই তরুণের। উত্তোলন করেন ১২৬ কেজি। পাকিস্তানের আবদুল্লাহ গফুর ১২৫ কেজিতে আটকে গেলে রৌপ্য পদক নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের। তখন প্রতীক্ষা এবারের এসএ গেমসের প্রথম স্বর্ণের। সকালে ব্যাডমিন্টন থেকে এসেছিল এবারের গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পদক ব্রোঞ্জ। মনে হচ্ছিল, বুঝি এদিনই স্বর্ণের মুখ দেখবে বাংলাদেশ। মুহূর্তেই এখবর ছড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়াম পাড়ায়। উডেন ফ্লোর জিমন্যাসিয়ামে উত্সুক কর্মকর্তাদের ভিড় বাড়তে থাকতে।
কে জানতো তখনও সেরা চমকটা লুকিয়ে রেখেছেন ২৫ বছর বয়সী যুবক ওয়াতা আসে কামার? স্ন্যাচ এন্ড ক্লিন রাউন্ডে ১৩৫ কেজি তোলার পরিকল্পনা করেন। তার এই সিদ্ধান্তে চমকে ওঠে সবাই। কিন্তু সেই চমকের রেশ মিলিয়ে না যেতেই দু’দফায় তুলে মাথার ওপর তুলে ধরেন ১৩৫ কেজি ডাম্বেল। এমন ছোটখাটো গড়নের শ্রীলঙ্কান ভারোত্তোলকের মাসলে এতো শক্তি! এরপর সুযোগ এসে যায় সেটা টপকানোর। ২ কেজি বাড়িয়ে ১২৮ কেজি ওজনের ডাম্বেল তোলার চ্যালেঞ্জ নেন একরামুল। সেটা করতে পারলে টাই। পরে আবারো লড়াই!
একরামুল উডেন ফ্লোরে দাঁড়াতেই উত্সুক হয়ে ওঠেন সবাই। কি হয় এই শঙ্কা! কিন্তু বাড়তি ওই দুই কেজি ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না! তুলতে পারলেন না ১২৮ কেজি। আর তাতেই ভারোত্তোলন ৫৬ কেজি বিভাগে স্বর্ণ নিশ্চিত হয়ে যায় শ্রীলঙ্কার ওয়াতা আসে কামালের। তবে হতাশ হওয়ার সুযোগ ছিল না একরামুলের। গত এসএ গেমসে ব্রোঞ্জের পর এবার রৌপ্য—উন্নতি তো হচ্ছেই। তাইতো পদকে চুমু খেয়ে মেহেরপুরের এই তরুণ বলছিলেন, ‘এটা ঠিক, স্বর্ণ জিততে পারলে আরো ভালো লাগতো। আমি নার্ভাস ছিলাম না। তারপরও এটা হয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখ নেই! দেখুন আমি এমন পরিবার থেকে উঠে এসেছি যেখানে মন খারাপকে প্রশ্রয় দেই না। আমার ভাই হামিদুল ইসলামও ভারোত্তোলক ছিলেন। ইসলামাবাদ গেমসে দেশকে ব্রোঞ্জ এনে দিয়েছেন আমার বড় ভাই। এবার আমি পেলাম রোপ্য।’ এখানেই থামলেন না ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেয়া এই ভারোত্তোলক। বলছিলেন, ‘গত এক বছর অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ মিলেছে। এখন এসএ গেমস শেষেও এই ধারাবাহিকতা থাকলে আমি এশিয়ান গেমসেও পদক এনে দিতে পারবো। আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। আশা করছি কমকর্তারা গেমস শেষে আমাকে ভুলে যাবেন না!’
কর্মকর্তারা শুনছেন?

দলীয়করণ, লেজুড়বৃত্তি

এসএ গেমসের জন্য বাংলাদেশ কি এখন সত্যিই প্রস্তুত ছিল?’ গতকাল কোনোরকম ভনিতা না করে প্রশ্নটা করে ফেললেন নেপালের সাংবাদিক মনোজ গিমেরা। প্রশ্নটা সঙ্গত কারণেই করেছেন সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের পঞ্চম দক্ষিণ এশিয়ান গেমস কাভার করতে আসা কাঠমান্ডুর এই সাংবাদিক। ১১তম এসএ গেমস শুরু হয়েছে তিনদিন হয়ে গেছে। কিন্তু সবকিছুই যে এখানে এখনও অগোছালো!
গতকালও অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ভবনে তৈরি মিডিয়া সেন্টারের সংস্কার কাজ চলছিল। দিনের বেশিরভাগ সময় ধরে চলা ড্রিল মেশিন নিয়ে ঠোকাঠুকির কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে অনেক সাংবাদিককে। এটা তো গেল মিডিয়া সেন্টারের ভেতরের সমস্যা। সেখান থেকে বেরিয়ে যে সাংবাদিকরা অন্য ভেন্যুতে যাবেন তার সুযোগ নেই। শাটল বাসের ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও সেটা গতকাল পর্যন্ত কথা হয়েই থেকেছে, বাস্তবতার ছোঁয়া মিলেনি! জুডোর লড়াই দেখতে তাই নিজ উদ্যোগেই সাভার যেতে হলো শ্রীলঙ্কান সাংবাদিক মহিন্দা বিবেলকে। শ্রীলঙ্কান রেডিও লাখান্দার এই সাংবাদিক বলছিলেন, ‘আমি এর আগে কোনো গেমসেই এমনটা দেখিনি। দেশের বাইরে যখনই গেছি গেমস কাভার করতে সঠিক গাইডলাইন পেয়েছি আয়োজকদের কাছ থেকে। এখানে তেমনটা নেই। আমার তো মনে হয় ইসলামাবাদ ও কলম্বো গেমস এর চেয়ে ভালো ছিল। ওরা অনেক আন্তরিক ছিল। এখানে নিজের উদ্যোগেই ভেন্যুতে যেতে হচ্ছে।’
এখানেই শেষ নয়, ভেন্যুতে গিয়েও খুব একটা সহায়তা মিলছে না!গতকাল প্রশ্নগুলো উঠতেই আয়োজক বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মহাসচিব কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলছিলেন, ‘দেখুন আমি একা কি করব? যখনই যেটা আমার কানে আসে আমি সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। এখন আপনার কাছে শুনলাম সাংবাদিকদের শাটল গাড়ি নেই, সেটাও সমাধান করব।’ আগামীকাল থেকে হবে— এই বলে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলেন মহাসচিব।
কিন্তু গতকাল সাংবাদিকদের হাতে আসা বিওএ’র তৈরি গেমস গাইড নিয়ে ঠিকই বিব্রত হলেন কুতুবউদ্দিন। ভুলেভরা ওই গাইড গতকাল তুলে দেয়া হয়েছে গেমস কাভার করা সাংবাদিক, প্রতিযোগী, কর্মকর্তা এবং লিয়াজোঁ অফিসারদের হাতে। তথ্যগত একাধিক ভুলে সয়লাব এই গাইড। যা তৈরি করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপি শাহরিয়ার আলম। তাইতো রাজনীতি থেকে দূরে থাকেনি এই সঙ্কলন। প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। এই গেমসের সঙ্গে এই ছবির রহস্য কি কে জানে! এখানেই শেষ নয়, তুলে ধরা হয়েছে শেখ মুজিবের সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী। গেমস গাইডে বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে তুলে ধরেছেন হাজারো ভুল তথ্য। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে বানানো হয়েছে দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক। একইভাবে আমার দেশ ক্রীড়া সম্পাদক এম. এম. কায়সারকে দেখানো হয়েছে যে, তিনি কর্মরত জনকণ্ঠ পত্রিকায়। এমন ভুলেভরা গেমস গাইড হাতে নিয়ে বিব্রত বিওএ মহাসচিব কাল বলছিলেন, ‘আমি জানি না ওরা কেন এমন ভুল করল। মহাসচিব হিসেবে এমন ব্যর্থতা আমারই।’ এই বলে এই প্রতিবেদকের সামনেই গেমস গাইডের প্রকাশক শাহরিয়ার আলম এমপির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন কুতুবউদ্দিন। কিন্তু টেলিফোনে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তবে মহাসচিব জানিয়েছেন ভুলগুলোর জন্য তারা লজ্জিত!
এভাবে অতি উত্সাহীদের এমন কাণ্ড অবশ্য এবারই প্রথম নয়। শোনা গিয়েছিল এসএ গেমসের প্রথম আমন্ত্রণপত্রে বঙ্গবন্ধুর ছবি জুড়ে দেয়া হয়েছিল। পরে কয়েকজনের আপত্তির মুখে তা বাতিল হয়। ছাপানো হয় নতুন ডিজাইনের আমন্ত্রণপত্র। আবার শেখ মুজিবের নামে গেমসের নামকরণের কথাও বলেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু গেমসের নিয়ম অনুযায়ী সেটা করা সম্ভব নয় বলে তা বাতিল হয়ে যায়।তারপরও দক্ষিণ এশিয়ার এই গেমসকে ‘দলীয় রাজনীতি’র বাইরে রাখতে পারছেন না অতি উত্সাহীরা! ১৭টি স্বর্ণপদকের টার্গেট নিয়ে এবারের গেমসে লড়ছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত কোনো স্বর্ণপদক জেতা হয়নি স্বাগতিকদের।
তবে ‘দলীয়করণ, লেজুড়বৃত্তি ও অব্যবস্থনার’— ‘হীরক পদক’(!) এখনই গলায় ঝুলিয়ে ফেলেছেন গেমসের ছোট—বড় কর্তারা!আখের গোছাতে হবে যে!