দূর থেকে ছবিটায় দেখি কুয়াশার আড়ালে অস্পষ্ট হয়ে উঠা সেই পথ, সময়, স্মৃতি... মুঠোর ফাঁক গলে হারিয়ে যাওয়া তীব্র জীবন। যে পথ অস্পষ্টতায় মাটিতে নেমে আসা মেঘমালার মতো খুব কাছের মনে হলেও আদতে ধরা যায় না! সে সরণি স্মরণাতীত হয়ে যায় চিরতরে...
ঘুমে-স্বপ্নে বহুবার চিরকালের চেনা এই পথের ধারে সূর্যের এমন কান্না দেখে আকুল হয়ে খুঁজে বেড়াই.... কী যেন! -শৈশব? সময় যায়, অহেতুক জীবনের বয়স বাড়ে! মেঘাচ্ছন্নতায় এই উজ্বল আলোর পথটাও মলিন হয়ে যায় ক্রমশ, এমন টলটলে জলের মতো স্বচ্ছ স্মৃতিতে সবুজ কচুরিপানার আস্তরণ। বুঝতে পারি কুয়াশাচ্ছন্ন এই আমাকে পুরোপুরি ফিরিয়ে নেবে না আর কোনোদিন।
দূর থেকে ছবিটা ডাকে; মায়ের মতো গভীর এক জলজ ডাক...আমি ধীরে নিঃশব্দে পা ফেলে কাছে যাই; বড় শহরের সমস্ত অবহেলা-অপমান সঙ্গী করে তার চিরচেনা ছায়ায় দাঁড়াই... বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই, ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমে; আমার সময়টা থমকে যায় এই শীতল ছায়ায়...এমন নিবিড়তায়!
দূর থেকে ছবিটা দেখি, ধূসর বেদনাময় রেখা প্রখর হয়ে ওঠে! হিসেব মেলে না, রঙ মিলিয়ে যেতে থাকে...কথা খুঁজে পাই না, তাই চুপ হয়ে যাই!
প্রতিটা মাসের মাঝামাঝিতে মনে হয় মাস ফুরাচ্ছে না, দিন গুনতে থাকি...! কিন্তু কী আশ্চর্য, চোখের পলকে ফুরিয়ে যায় একেকটা বছর। বয়স বাড়তে থাকে সবার। ২০২২-এর শুরু এইতো সেদিন, কিন্তু নিমেষে বছরটা হাওয়া!
২০২২ নানা কারণে মনে থাকবে। পরিবারের কয়েকজনের অসুস্থতা ছাড়া বছরটা মনের মতো কেটেছে। জীবনের উত্থান-পতন, ঠেকে শেখা, মানিয়ে নেওয়া এসব গল্প তো ছিলই, সঙ্গে অসাধারণ কিছু মানুষের দেখা পেয়েছি সদ্য শেষ বছরে। অনেক নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি, জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা...
২০২৩, এই বছরটা আরও চ্যালেঞ্জের। টিকে থাকাটা আরও বেশি করে রপ্ত করতে হবে। একটু ধৈর্য আর বিশ্বাস নিয়ে প্রতীক্ষায়... প্রতীক্ষার মূল্য নিশ্চয়ই আসবেই, সবার জীবনে!
বছরটা শুভ হোক প্রত্যেকের!
Happy New Year... I hope all your dreams come true in 2023. Onwards and upwards!
শৈশবের স্মৃতিগুলো কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া পথেরই মতো অস্পষ্ট যাচ্ছে, একটু একটু করে! একটা সময় চোখ বন্ধ করে একটু ভাবনার অতলে ডুবলেই নিমিষে খুঁজে পেতাম সেই সব সময়... অফুরন্ত একেকটা আনন্দমাখা দিন।
আমাদের সেই ধুলো উড়া পথ, তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট একটা বিল... প্রাণের সুতার লহরি। বর্ষায় থৈথৈ পানি আর শীতে কচুরিপানায় আড়াল হয়ে থাকতো ছোট-বড় খাঁদ। পানি কমতে থাকলে তারপর একটা সময় পরীক্ষা শেষে স্কুল ছুটি হলেই সেই খাঁদ সেচে চলতো দিনভর মাছ ধরা! আহা, মিষ্টি মধুর স্মৃতির দলের মতো ঝাকে ঝাকে কতো মাছ, পুটি, শিং, মাগুর, কৈ...ছোট্ট একটা জায়গায় কতোশত মাছ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেও মাছ ধরা শেষ করতে পারতাম না কিছুতেই।
আমাদের বাকি বিকেলগুলো চলতো ধুলো উড়িয়ে ফুটবল কিংবা ব্যাট-বলের লড়াইয়ে। শীতের শেষ বিকেলে র্যাকেট-ফ্লাওয়ারে ঘাম ঝরানো ছাড়াও অলস কিছুদিন ছিল আমাদের। যে দিনগুলোতে পুরো পশ্চিম পাড়া দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতাম আমরা। এখানে সেখানে পেয়াদা বাড়ি, তেতুল তলা, এই বাড়ি সেই বাড়ি...!
গন্ডারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমাদের পুরোনো সেই স্কুল ঘরটা এখনো চোখে ভাসে। মনে হয় এইতো সেদিন ভাঙ্গা জীর্ণ হয়ে আসা মরিচা পড়া টিনের দোচালা সেই স্কুলের বেঞ্চে বসে আছি। নারান্দীর হেড স্যার কড়া চোখে তাকাচ্ছেন। ব্ল্যাক বোর্ডে নজর নেই বলে বেত নিয়ে মারবেন বলেও মারছেন না। মমতাজ উদ্দিন স্যারের ঘুম ঝরানো কণ্ঠটা ভাসে! স্কুলের ছোট্ট মাঠটার পাশে মেম্বার দাদার দোকান। পুরো গ্রাম জুড়ে তখন একটাই মুদির দোকান, চাল-ডাল, তেল-সাবান, ডাক্তারি পথ্য এমন কী কাফনের কাপড়ও! দুপুরে নিস্তরঙ্গ সময়টাতে দাদা দোকানের মধ্যেই নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়তেন, কেউ অপেক্ষা করতেন কখন ঘুম ভাঙবে। আবার কেউ হয়তো ডেকে তুলে এক পোয়া কেরাসিন তেল নিয়ে যেতেন সন্ধ্যার হারিকেন জ্বালাবেন বলে।
স্কুল ছুটি হলে আমরা এদিক-সেদিক তাকাতাম না। সোজা এক দৌড়ে মাটির রাস্তা ধরে ঘরের পথে। বাড়ি ভর্তি আনন্দ আমাদের, সরকার বাড়ি। মানুষে প্রতিটা ঘর কী যে সরগরম থাকতো। পড়াশোনার সঙ্গে খেলাধূলা.. এটা সেটা পিকনিক, তারমধ্যে একটা সুস্থ প্রতিযোগিতাও থাকতো সব সময়। সবার ঘরে একটা করে পাঠাগার, বই পড়ার প্রতিযোগিতা, পড়াশোনায় এগিয়ে যাওয়ার একটা লড়াই!
এরমধ্যে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট এলো আমাদের গ্রামে। দিন তারিখ মনে নেই-হতে পারে ৮৮ থেকে ৯০! আসলেই স্মৃতির পথগুলো শীতের কুয়াশার আড়ালে চলে যাচ্ছে বড্ড অস্থির হয়ে দ্রুত! কিন্তু সেই একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট ভুলতে পারবো না একেবারে অশীতিপর হয়ে চলে গেলেও।
আমাদের পুরো গ্রাম একদিকে আর সরকার বাড়ি অন্যদিকে। কী যে এক উন্মাদনা! ঠিক তখনই আমাদের সামনে এলেন এক নায়ক। তিনি আমার চোখে এখনও নায়ক। ছোট্ট গড়নের, পেটানো শরীর। আহা, এই মানুষটার পায়েই কী যে যাদু। আমরা তখন ডিয়েগো ম্যারাডোনার মুগ্ধতা সবে হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছি, ঠিক তখনই আমাদের সামনেই আরেক ফুটবল জাদুকর। শুধু কী পা, মাথাতেও সমান দক্ষতা। বুলেট গতির শটের সঙ্গে দারুণ সব হেড! তার সেই ম্যাজিকই আমাদের এক সুতোয় গেঁথে দিল। সেই প্রথম আমাদের সরকার বাড়িটাকে সবাই ধারণ করতে শুরু করলাম...মন প্রাণ দিয়ে! এই বাড়ি কতো প্রতিভার জন্ম দিলেও তিনিই হয়ে থাকলেন প্রথম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর!
মাঠের সেই মানুষটি আঘাতে লুটিয়ে পড়লে আমরাও ভেঙে পড়ি। তিনি নিশানা খুঁজে পেয়ে হেসে উঠলে আমরাও হাসি। তার একটা বাই-সাইকেল কিক দেখার জন্য সাইড লাইনের বাইরে অধীর হয়ে থাকি মিনিটের পর মিনিট। এখনো কান পাতলে সেই হাসি সেই সময়টা অস্থির সেতারের শব্দের মতো আকুল হয়ে এসে ধরা দেয়। আমি ভুলতে পারি না সেই সব মুখ, সেইসব মানুষ যারা আমার শৈশব রাঙিয়ে তুলেছিলেন। যারা ছিলেন বলেই বারবার ব্যাকুল হয়ে উঠে আমার মন, সব অর্জনের বিনিময়ে হলেও ফিরে যেতে চায় একটি দিনের জন্য সেই সব ধুলো উড়া বিকেলে.. প্রচন্ড বৃষ্টিতে বিলের মাঝখানটায়, জাদুবাস্তবতাবাদ! তেমন একটা অলস দুপুর আর আসে না।
মানুষ কোথায় হারিয়ে যায়? আমাদের শৈশব স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ভাইজান চলে গেছেন অনেক আগেই। দিন-তারিখ কিচ্ছু মনে রাখতে চাইনি বলে মনেও নেই তিনি হারিয়ে গেছেন নিঃস্ব করে আমাদের। আলম কাকাও হঠাৎ একদিন না বলে আমাদের শৈশব স্মৃতিটুকু সঙ্গে নিয়ে উধাও!
এবার সেই নায়কটিও আর নেই। দর্পন কাকা, সেই আমাদের ছোট্ট বেলার ম্যারাডোনা। তিনি আমাদের-এটা বলতে পারলেই গর্বে উঁচু হয়ে উঠতো মাথা। যিনি ফুটবল পায়ে লিখতেন রূপকথা। বল নিয়ে কারিকুরিতে মনে করিয়ে দিতেন ফুটবল নিছক খেলা নয়, কবিতা, গল্প-উপন্যাস সবই। যার হাত-চোখে এমনই নিশানা যে ছোট্ট একটা এয়ারগানে গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিকারও নিমিষে নেমে আসতো মাটিতে!
আহারে সময়, কিছুতেই লেখার ফ্রেমে আটকাতে পারছি না মূহুর্তগুলো। বিচ্ছিন্ন হয়ে স্মৃতিরা সব চিৎকার করেছে কিন্তু কারও কথা কোন ঘটনাই ঠিকঠাক বলে উঠতে পারছি না। আবেগ থেকে বেরোতে না পারলে আসলে নির্মোহ সেই গল্পেরা ওঠে আসে না, কথায় গল্পে। এলোমেলো অসম্পূর্ণ এইসব কথার মানেটা অন্যদের কাছে হয়তো দুর্বোধ্য-অগভীর। আমাদের কাছেই তা অপরিমেয়!
দর্পন কাকাকে কবর দিয়ে শহরের পথে ফিরতে ফিরতে কথাগুলো ভাবছিলাম। কুয়েতে নিমর্ম প্রবাস জীবন শেষে উনার নিথর দেহটা কফিনে বন্ধী হয়ে এসেছিল একদিন আগেই! বাড়ি ফিরে এবার তিনি চিরদিনের জন্য নিশ্চিন্তে ঘুম দিয়েছেন।
আমি তখন মনোহরদী থেকে ঢাকার পথে। বাইরে অন্ধকার। আমার ভেতরটা গভীর অন্ধকার! একরাশ দীর্ঘশ্বাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মাথায় সব স্মৃতির দল যেন ঝাঁকের ইলিশের মতো ঘুরছে, এই আলো-আঁধারিতে! মানুষ বড্ড অসহায়, কিছুই তার হাতে নেই। না, জানি কিসের আশায়, ক্ষাণিক ভাল থাকার প্রলোভনে অন্তবিহীন পথে শুধু ছুটে চলা, তারপর এভাবেই একদিন ধপ করে নিভে যায় ধুপছায়া!
ভাগ্য সঙ্গে নিয়ে আসা কেউ গোধূলী বেলায় পড়ন্ত দিনের দেখা পায়; কেউ আবার মধ্য দুপুরে মাঝ পথেই পথ হারিয়ে কী জানি কোন অভিমানে হাঁটা দেন অসীমের পানে...! আহারে মানব জনম, ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর...’
বিশ্বাস খুঁইয়ে মেয়ের কাছে কি ছোট হয়ে যাবে বাবা? আনন্দ, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, ধুসর, সবুজ কালো রঙ... তারপর কোন এক দিনে বাবার কাছে ফিরে আসে টুকুন! বাবা তখন বসে শ্যাওলাসমাকীর্ণ পুকুরঘাটে। চিত্রকর বাবাকে দেখে চমকে উঠে কন্যা। ভেঙে যাওয়া বাবা কী তবে পালাতে চান?
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের আলো-আঁধারে টুকুনকে দেখে তার মনে হয় যেন হাজার হাজার ফিট জলের গভীর থেকে ওঠে আসা। বাবা তার কন্যার গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলা, বালি, জলের দাগ মুছতে মুছতে তার ভেতর এমন একটা দীঘির দেখা পান যেখানে ডুব দিলে তাকে আর টুকুন খুঁজেই পাবে না!
কবিতার মতো এক ছবি- সাঁঝবাতির রূপকথারা। দুপুর থেকেই চোখে ভাসছে দৃশ্যের পর দৃশ্য। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলেই গেলেন। এমন এক দীঘিতে ডুব দিলেন যে হারানো রূপকথারা টুকুনের জীবনে ফিরলেও তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না, পুরনো শহরে কিংবা নতুন কোন চ্যালেঞ্জে!
বেশ কয়েকদিন ধরেই শঙ্কায় দিন কাটছিল সবার। অনেকদিন ধরে চাইছিলাম- এমন কিছু না হোক। মিরাকলের কাছেই সমর্পণ ছিল।
তারপরও যখন হয়নি.. যখন তিনি, একদম তারই মতো করে বলে গেলেন, ''আজ তবে আসি'', তখন বরং চলুন এই চলে যাওয়া সেলিব্রেট করি। অনেক দিয়েছেন আপনি। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আজ ১৫ নভেম্বর অমরত্ব পেয়ে গেলেন, সৌমিত্র দা।
আমি আসলে আপনার কাজকে আলাদা করতে পারিনা। তরুণ সৌমিত্র, যুবক সৌমিত্র কিংবা শেষ বয়সের সৌমিত্র। অতিনাটকীয়তা রেখে গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গি, গভীর নির্মোহ দৃষ্টি, সব সময়ই টেনেছে! টানবে আজীবন!
চলে গেলেন, এবার চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকুন প্রতিটি বাঙালির ঘরে... অপু, অমল, ময়ূরবাহন, ক্ষিদ্দা, শ্যাম, নরসিংহ, গঙ্গাচরণ, সন্দীপ, অঘোর, সুবীর কিংবা চিরচেনা ফেলুদা হয়েই।
''নাছোড়বান্দা স্মৃতি সাদা আর কালো জুড়ে
অপুর পায়ের ছাপ ডুবছে বাঁশির সুরে..''
'পাশ দিয়ে পথ গেছে দূরের থেকেও দূরে'; এই আমাদের গ্রাম। আমার হৃদয়ের খুব কাছের কাঁচা মাটির ধুলো ওড়া পথ। ধানের জমি, ছোট্ট আম বাগানের পাশ দিয়ে একেবেঁকে যাওয়া হারানো শৈশব। সকাল, মধ্য দুপুর কিংবা শেষ বিকেলের আলোয় এই পথ ধরে কতোবার যে হারিয়ে গেছি, হিসেব নেই!
কাঁচা আমের আটি দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে লিখেছি, ''আমিই সেই অপু।'' পথের পাঁচালী' তো আমারই গল্প।
সারি সারি কাশফুল পেরিয়ে তাইতো একদিন আমিও ছুটে গেছি, সেই ধোয়া উড়িয়ে যাওয়া চলন্ত ট্রেন দেখবো বলে।
লেবুর পাতা করমচা! আহ, আমার সেই মুঠোর ফাঁক গলে হারিয়ে যাওয়া শৈশব। 'সময়ের রেলগাড়ি', সব এলোমেলো করে দিয়ে গেল। কতো আকুতি, শত অনুনয়-ফিরেও আসে না আর!
সেই সিথি কাটা চুলে স্মৃতির পথ ধরে হেটে চলা 'অপু' হয়ে উঠা হয় না আমার, হবেও না আর এই জনমে...
একজন মানুষের জানা দরকার জীবনের শেষ ধাপ কোথায়? আমরা যদি একটা ধাপে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সময় থাকি তাহলে আমরা অন্য ধাপগুলোর আনন্দ আর উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হবো। জীবনের এইসব ধাপগুলো পূর্ণ করা, দরজা বন্ধ করা, অধ্যায়ের ইতি টানা, আসলে যাই বলা হোক না কেন আসল কথা হলো যে অতীত, যে সময় ফুরিয়ে গেছে তাকে পেছনে ফেলে আসা।
সম্পর্ক ভেঙে গেছে? চাকরি চলে গেছে? বাবা-মার বাসা থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছে? কিংবা অনেক অনেকদিনের গড়া বন্ধুত্বা এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেছে?
কেন চাকরি গেল, কেন সম্পর্ক ভাঙলো, কেন সব শেষ? ‘কেন’-র ভুবনে ডুব দিয়ে অনেক সময় পার করা যায়।
অনেক অনেক মুহূর্ত চিন্তা করে কাটিয়ে দেয়া যায়। জীবনের এইসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো কেন হঠাৎ আচমকা ধুলোর সঙ্গে মিশে গেল সেই কারণ খুঁজে বের করার আগে আপনি হয়তো একটুও এগোতো চাইবেন না, পা চলতে চাইবে না! ‘সব শেষ’ নামের হাহাকার সেই ‘কেন’-র উত্তর খুঁজতে আপনাকে অহর্নিশ পাগল করে দেবে।
কিন্তু এমন আচরণ আপনাকে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন আর সন্তানের ওপর চাপ তৈরি করবে। সেই চাপ অসহনীয় হয়েও যেতে পারে। আসলে সবাই তাদের জীবনের ধাপগুলো শেষ করছে, করেছে। পাতা উল্টাচ্ছে, জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। আর সেই তারাই আপনাকে এক জায়গায়, একই বৃন্তে আর একটাই প্রশ্নের সামনে আটকে থাকতে দেখে মন খারাপ করবে।
সত্যি বলতে কী, যা চলে যায় তাকে চলে যেতে দেওয়াই উচিত। সেটা করতে গিয়ে যত তীব্র বেদনাই হোক অতীত সেই সম্পর্ক, স্মৃতির স্যুভেনিগুলো ভেঙে দিন, সরিয়ে ফেলুন, প্রয়োজনে দান করে দিন কোনো এক অনাথ আশ্রমে, বিক্রি করে দিন, স্রেফ ভুলে যান।
এই আলো-বাতাস, দৃশ্যমান পৃথিবীর সবকিছুই হলো অদৃশ্য পৃথিবীর ছায়া। আমাদের যাপিত জীবনে কিছু স্মৃতি ফেলে দেয়ার অর্থ একটাই-নতুন কিছু স্মৃতির জন্য তৈরি আপনার মন, আপনি নিজে। যে চলে গেছে, চলে যেতে চায় তাকে ছেড়ে দিন। সেই সব মানুষ আর তাদের থেকে নিজেকে মুক্ত করুন।
আমার মনে হয় জীবনটা স্রেফ তাস খেলার মতো। আসলে কার্ডগুলো আমরা কেউ চিনে রাখি না। তাই কখনও আমরা জিতে যাই, আবার কখনও বা হেরে যাই। কোনো প্রতিদান আশা করবেন না, না কোনো প্রতিদানই নয়। বাহ-বা-র আশাও করবেন না। আপনার মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে কী হচ্ছে না, ভালোবাসা পেলেন কী পেলেন না ভাবার দরকার নেই।
কিছু একটা হারাতে আপনি কতটা কষ্টে নীল হয়েছেন, কতটা ভুগেছেন? -অনুভূতির জানালা খুলে, আবেগের টেলিভিশন খুলে সেই অনুষ্ঠান বারবার দেখা বন্ধ করুন। এসব কিছু আপনার মনকে বরং বিষন্ন করে দেবে। একটু একটু করে নিজের অজান্তেই আরও বেশি একা হয়ে উঠবেন আপনি। এছাড়া আর কিছুই হবে না, হয়ও নি কোনোদিন!
ঠিক না থাকা কাজের প্রতিশ্রুতি, ভেঙে যাওয়া প্রেম এসব মেনে না নেয়ার মতো বোকামি আর ক্ষতিকর কিছুই হতে পারে না।
জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরুর আগে আগের অধ্যায়টিকে শেষ করতেই হবে। হাসিমুখে নিজেকে বলুন-যা চলে গেছে তা একেবারেই গেছে, ফিরে আর আসবে না কখনও। যে জিনিস কিংবা যে মানুষটাকে ছাড়া একসময় বেঁচেছিলেন সেই সময়ের কথা ভাবুন। সবকিছুই প্রতিস্থাপনীয়। অভ্যেস আর প্রয়োজন এক ব্যাপার নয়।
কথাগুলো অবশ্য বলে ফেলা গেল অনায়াসে মেনে নেয়া কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। একটু একটু করে প্রতিদিন জীবনের চক্রটা পূরণ করুন। গর্ব, অপ্রাপ্তি, অক্ষমতা আর অহংবোধের জন্য নয়, আপনার জীবনের সঙ্গে ব্যাপারগুলো যায় না সেই কারণে কাজগুলো করুন। আর দরজা বন্ধ করে দিন, প্লেয়ারের সিডি বদলান, ঘরটা পরিস্কার করুন, ধুলো-বালি ঝেড়ে ফেলার এইতো সময়।
অতীতের ‘আমার আমি’র মধ্যে আটকে না থেকে বরং হয়ে উঠুন ‘বর্তমানের আপনি...’
................................................................
-পাওলো কোয়েলহোর ব্লগে পাওয়া লেখাটি স্বাধীনভাবে অনুবাদ করেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। অনেক প্রিয় এই লেখাটা তুলে রাখলাম টাইমলাইনে।
আফগানিস্তানের আকাশে উড়ন্ত বিমান থেকে দুজনের পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ভুলতে পারছি না। সোমবার দুপুরে কাবুল বিমানবন্দরে ঘটেছে এই দুর্ঘটনা। দেশ ছাড়তে বিমানের
নেন এই দুই আফগান। বিমান আকাশে উড়তেই ছিটকে পড়লেন তারা!
তারার মতো ঘসে পড়ল দুটি তাজা প্রাণ।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রীতিমতো ভাইরাল! সত্যি বলতে অদ্ভুত এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। কতোরকম রাজনীতি যে গোটা বিশ্বজুড়ে!
জানি না কী হচ্ছে, তবে এটুকু বুঝতে পারছি.. ফের এই রাজনীতির শিকার শুধু সাধারণ মানুষ। যারা একটু ভাল থাকার প্রলোভন সঙ্গী করে বেঁচে থাকতে চায়...
ফরএভার বলে কিছুই হয় না। চিরতরে, চিরকাল বলে কিছু নেই। ২১ বছর, দুই দশকের দৃঢ় এক বন্ধন, একটা পরিবার আর আকাশ ছোঁয়া আবেগ সব নাই হয়ে গেল এক মুহূর্তে। কেউ কাউকে ছাড়তে চায় না, একসঙ্গে থাকতে চায় একটা জীবন; অথচ অদৃষ্টির কী পরিহাস, কী একটা যে হয়ে গেল।
চোখের জলেই লেখা হয়ে থাকল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচ্ছেদের গল্প...
কান্নার আড়ালে তোমার ওই অভিমানী মুখ কোথায় যেন আশার প্রদীপটাও জ্বালিয়ে দিল আজ। সব পাখি যেমন ঘরে আসে, তেমন করেই তুমি একদিন ফিরবে জানি... এই এখানেই যেখানে তোমার হৃদয়টা রেখে গেলে। যেখানে প্রতিটা ঘাস তোমার চেনা, যেখানে হাজারো রাতজাগা রোমাঞ্চের কাব্য লিখে গেছো সোনায় মোড়ানো দুই পায়ে।
আমরা খুঁজবো তোমাকে... ফের আরেকবার।
কাঁদলে, কাঁদালে... কী একটা হাহাকার যে ছড়িয়ে দিলে আজ এই বিদায় বেলায়।
আহা, বড্ড বেশি মিস করবো তোমাকে, প্রিয় লিও
‘এই কুলফি লাগবে কুলফি...’ -দূর থেকে কাছে
আসছিল শব্দটা! গলিতে উঁচু গলায় এমন হাঁকডাকে কেমন যেন স্বস্তির পরশ ছুঁয়ে
গেল। প্রচন্ড গরমের কারণে কিনা কে জানে কুলফি মালাই- শব্দ দুটো কানে আসতেই
অন্যরকম এক প্রশান্তি অনুভব করলাম। খাঁটি দুধে চিনি, এলাচ, বাদাম, কিশমিশ
আর গরম মসলার মিশ্রণে এক অমৃত স্বাদের আইসক্রিম! ১৬শ শতাব্দীতে মুঘল
সাম্রাজ্যে যে হিমায়িত মিষ্টান্নের পথ চলা, তার আঁতুড় ঘর এখন কুষ্টিয়া।
ঢাকার অলি-গলিতে কান পাতলে প্রায়ই
ভেসে আসে- কুষ্টিয়ার রশিদ ভাইয়ের কুলফি মালাইয়ের বিজ্ঞাপন। সেটা কতোটুকু
খাঁটি তা নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই! তবে সত্যিকারের কুলফি মালাই পেতে আপনাকে
আসতে হবে সীমান্তবর্তী অঞ্চল কুষ্টিয়ায়।
খাঁটি দুধে চিনি, এলাচি, বাদাম, কিশমিশ আর গরম মসলার মিশ্রণে এক অমৃত স্বাদের আইসক্রিম
স্বাদের সঙ্গে সুঘ্রাণেরও যে নিবিড় একটা
সম্পর্ক আছে, সেটা তুলোর মতো নরম কুলফিতে কামড় দিয়ে আঁচ করতে পারলাম।
কুষ্টিয়ায় বেড়াতে এসে স্বাদ নেওয়া হলো কুলফি মালাইয়ের। দৌলতপুরের আল্লার
দর্গায় দেখা মিলল ৩৭ বছর বয়সী যুবক মোহাম্মদ আশরাফুলের সঙ্গে। যার জন্মের
পরের পুরোটাতেই জড়িয়ে আছে লালন সাঁইজির অঞ্চলের এই ডেজার্ট!
কুমারখালির উত্তর কয়ার ছেলে আশরাফুল।
এটা জানিয়ে রাখা ভাল- কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া আর শিলাইদহ'র বেশ কয়েকটি
গ্রামের অনেকেই পেশায় কুলফি বিক্রেতা! আশরাফুলও তাদের একজন। যিনি নিজের
তৈরি কুলফি সিলভারের হাঁড়িতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান কুষ্টিয়া আর কুমারখালীর
রাস্তায়!
অভাবের সংসারে বেড়ে উঠা আশরাফুলের।
বাবা নেশার জগতে গিয়ে বিক্রি করে দেন শেষ সম্বল ভিটেটুকুও। তিনভাই পড়ে যান
অকুল পাথারে। ঠিক তখনই কিশোর আশরাফুল পেয়ে যান আব্দুল জলিল মিয়ার দেখা। এই
নামটা এই অঞ্চলে বেশ বিখ্যাত। কারণ তার হাত ধরেই যে কুলফি সারা বাংলাদেশে
জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনি বেঁচে নেই, তার ছেলেরাই এখন বাবার ব্যবসা আর
সুনামের হাল ধরেছেন।
আশরাফুলের কুলফি মালাই
জলিল মিয়ার কাছেই আশরাফুলের হাতেখড়ি।
শিখেছেন কিভাবে গরুর খাঁটি দুধের সঙ্গে কিশমিশ, চিনি আর সামান্য মসলায়
যাদুকরী স্বাদের মালাই তৈরি করা সম্ভব। ব্যস এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে
হয়নি। আশরাফুল বলছিলেন, ‘ওস্তাদ শিখাই দিতিই আমি আর
এলাকায় থাকলাম না। সুজা চইলি গেলাম ঢাকায়। মিরপুর, খিলগাঁও, ফার্মগেট
ম্যালা জাগাতেই ফেরি কইরি বিক্রি করিছি কুলফি মালাই। বলতি পারেন এরপরই আমার
দিন ফেরেছে!’
বাবা ছিলেন সংসার বিবাগী, অগোছালো।
আশরাফুল পিতার বেখেয়ালি জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে একেবারেই এক সংসারী মানুষ।
যখন হাতে কিছু পয়সা এলো আর দেরি করেন নি, ফিরে এসেছেন কুষ্টিয়ায়, কয়া
গ্রামে। সংসার পেতেছেন। সন্তানও হয়েছে। নিজের জীবনের গল্পটা বলছিলেন, ‘বড়
কিছু করার ইচ্ছা নিকো আমার। সব সুময় ঝামেলা মুক্ত থাকতি চাই। এই কারণেই
ঢাকায় থাকলাম না। চইলি আলাম গ্রামে। এখন এক ছেলে আর এক মেয়ের সংসার আমার।
ভালই আছি আমি।’
মহামারি করোনা এসে গরমে ব্যবসার ঠিক
সময়ে বড় ক্ষতি করে দিয়েছে আশরাফুলের। এমনিতে মাস শেষে কম করে হলেও ২০ হাজার
টাকা লাভ থাকে। কিন্তু করোনার সময়ে অনেকেই ভয়ে ঠান্ডা মালাই খেতে চায় না।
আবার শীতকালে তো আইসক্রিম চলেই না। তখন অবশ্য বসে থাকার মানুষ নন
আশরাফুল। কুষ্টিয়ার আরেক বিখ্যাত খাবার তিলের খাজা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
যদিও কুলফি মালাই বিক্রেতা হিসেবেই
নিজের পরিচয় দিতে ভালোবাসেন তিনি। কারণ এই খাবারটায় যে তার নিজের স্বাদ,
রুচি লেগে আছে। নিজের হাতেই প্রতিদিন তৈরি করেন কুলফি। প্রতিদিন ২০ কেজি
দুধ জ্বাল দেওয়ার কাজটা অবশ্য তার ঘরণীই করে। স্বাদের বাকি সিক্রেট থাকে
তার হাতে! ১০০ থেকে ১৫০ পিস কুলফি নিয়ে বের হন প্রতিদিন। ১০, ২০, ৩০ টাকা
থেকে ৫০ টাকায় মেলে একেকটি কুলফি।
লালসালু কাপড়ে মোড়ানো সিলভারের
পাতিলে বরফের আড়ালে রাখা কুলফি নিয়ে হাঁক দেন রাস্তায়, অলিতে গলিতে।
আশরাফুলের কী ইচ্ছে করে না ব্যবসাটা আরও বড় করতে। নিজের নামে বিজ্ঞাপন করে
আরও নাম কামাতে?
খাঁটি দুধের তৈরি কুলফি মালাই
-প্রশ্নের জবাবে হাসিমুখে কুলফি'র
কাবুলিওয়ালা বলছিলেন, ‘বুঝতি পারছি আপনে রশিদের কথা বলতি চাইছেন। আসলে
সত্যি হলো জিনিস ভালো হলি অ্যাডভার্টাইজের দরকার হয় না। মানুষ আপনেক এমনি
খুঁজি নিবি।’ আশরাফুলের তৈরি খাঁটি দুধের কুলফিতে কামড় দিয়ে এই কথাটাই মনে
হলো আমার! মনে হচ্ছে আমি নিজেও হয়তো এখানে পা রাখলে খুঁজে নেবো তাকে!
তবে কিছুতেই এই পেশায় নিয়ে আসতে চান
না ছেলেকে। এভাবে ফেরি করা কষ্টের জীবন দিতে চান না ছেলেকে। আশরাফুল
বলছিলেন, ‘ম্যালা সময় নিয়ে বানানো এরপর মাথায় করি ৩০ কেজি ওজনের পাতিল
নিয়ে ঘুরি বেড়ানো অনেক কঠিন কাজ। এটা আমি কখনোই আমার ছেলেকে করতি দেবো
না। ওকে বলেছি তুই মন দিয়ে পড়াশোনা কর। যা কষ্ট করার আমিই করি!’
কথাটা শেষ করেই অবশ্য জিভে কামড় দিলেন
আশরাফুল। না একটুও কষ্ট নেই তার। তিনি সুখী। কোনো দুঃখ নেই। হাসি মুখে
জানাচ্ছিলেন, ‘যখন আপনাগোর মতো মানুষরা আমার কুলফিতে কামড় দিয়ে দুটা
প্রশংসা করে তখন সব ভুইলে যাই। মনে হয় আমার জন্মই তো হয়েছে কুলফি বেচার
জন্য!’
এভাবে ভাবতে পারেন বলেই শত অভাবের
মাঝেও আশরাফুলদের জীবন সুন্দর। তাদের বেঁচে থাকাটা আরও সুন্দর! কথাগুলো
যখন ভাবছিলাম তখন কাছ থেকে আরও দূরে হারিয়ে গেল আশরাফুলের চড়া গলা-‘এই
কুলফি লাগবে কুলফি...!’
অনেক দিন তো বাস মালিকদের স্বার্থ দেখা হলো, স্বাস্থ্যবিধিকে যখন বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে তখন ৬০% বাড়তি ভাড়াই দিয়ে যাবো কেন?
মহামারির সময়ে সাধারণের দুঃখ-কষ্টের কথা একটু ভাবুন, আগের ভাড়া ফিরিয়ে
আনুন প্লিজ! স্বাস্থ্যবিধি শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব ঠিক রেখে দুই সিটে এক
যাত্রী যখন বসানো হচ্ছে না, তখন বাড়তি ভাড়া দেবে কেন জনগন?
আপনার গান শুনেই বেড়ে উঠেছি আমরা। বিনোদন মানেই তখন বাংলাদেশ বেতার।
যেখানে সিনেমার গান মানেই এন্ড্রু কিশোর। অনুরোধের আসর, গানের ডালি,
দুর্বার কিংবা নাজমুল হুসাইনের ধারা বনর্নায় ১৫ মিনিটের সিনেমার ট্রেলর!
দুই ব্যাটারির রেডিও থেকে টেপ রেকর্ডার...আমাদের শৈশবের একটা দিনও সম্ভবত
আপনার গান ছাড়া কাটেনি।
শুনতে না চাইলেও রেডিওতে, ক্যাসেট প্লেয়ার
এমন কী পাড়া-মহল্লা কাঁপিয়ে মাইকে এখানে সেখানে কোথাও না কোথায় বেজে
উঠতো আপনার গলায়... ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, কিংবা ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল
আমারে’। কতোশতবার শুনেছি ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘হায় রে মানুষ
রঙিন ফানুস’... ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’,‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, আমার
বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা
পেলাম না’, কিংবা ‘কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া...এমন কতশত গান
বলে শেষ করা যাবে না।
আমাদের সুখ-দুঃখ ভালবাসা-বিচ্ছেদ সবকিছুতেই আপনার একের পর এক যাদুকরি গান। প্লে-ব্যাক এন্ড্রু কিশোর ছাড়া হয় নাকি!
আহা সেইসব মধুর দিনের স্মৃতি ফের জাগিয়ে দিয়ে চলে গেলেন আজ। জীবনের গল্প
ফুরাল! কিন্তু আপনার সুর, সেই দরদ, মায়ায় মোড়ানো কণ্ঠস্বর চাইলেও
কোনদিনই ভুলতে পারবো না আমরা।
২৩ বছর আগে শীতের এক শেষ বিকেলে চলে গিয়েছিলেন আপনি।
ক্লান্ত
একটা দিনের শেষে গোধূলী যখন বিষন্ন আলো ছড়িয়েছে তখন আকাশ-পাতাল এক করে
আমরা কেঁদেছি। আম্মা আর আমরা চার ভাইবোন! এখনো আমি কাঁদি, যা কিঞ্চিৎ
প্রার্থনা তার শেষটাতে এসে আকুল হয়ে কাঁদি, নোনা জলের ঝাপটায় ঝাপসা হয়ে
ওঠে চোখ! সেই চোখের জল শুকিয়ে গেলে গলার কাছে এসে কষ্টরা আহাজারি করে..
তখন আরও বেশি যন্ত্রণায় পুঁড়ি।
কেউ বুঝতে পারে না, কিন্তু এখনো এতোদিন পরও আপনাকে খুঁজে বেড়াই। জীবন যুদ্ধে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে গেলে বটবৃক্ষের সেই ছায়া, শাসন আর সাহসের শিকড় খুঁজে বেড়াই।
জানি আপনি আর ফিরে আসবেন না আব্বা; কিন্তু ওপারে ওই দুনিয়াতে আপনি যেন
সুখে থাকেন সেই প্রার্থনা করে যাই অহর্নিশ। করুণাময় নিশ্চয়ই শীতল ছায়া দিয়ে
রেখেছেন আপনাকে। আর এটাও জানি নিশ্চয়ই সেই রহস্যময় জগতে বসেও বিশ্রাম নেই
আপনার, আমাদের মঙ্গল কামনায় তসবিহ জপে যাচ্ছেন, ক্লান্তিবিহীন নিরন্তর....!
এরপর ভারত সফরে নভেম্বরে আসল পরিচয়ের শুরু। দিল্লির পর ভারতে যতোগুলো
শহরে থেকেছি প্রতিটিতেই আমরা সহযাত্রী! আর এই সময়টাতেই নাজমুস সাকিবকে
প্রতিনিয়ত নতুন ভাবে আবিস্কার করেছি। কর্ম চঞ্চল, প্রতিভাবান প্রাণবন্ত এক
তরুণ!
অন্যরা যখন ভাবতে থাকে ধীর-সুস্থে রিপোর্ট কিংবা ভিডিওটা
বানাবো, সাকিব তখন সেটা পাবলিশ করে ফেলে। চোখের পলকে গাড়িতে বসে, রাস্তায়
হেটে, হোটেলে খেতে খেতে মোবাইলে চটজলদি বানিয়ে ফেলে দুর্দান্ত সব রিপোর্ট। ভারতে একমাস দেখেছি-সবার আগে ওর কাছে কাজ, তারপর অন্যকিছু।
না, একটু ভুল বলা হলো.. পরোপকারী সাকিবকেও দেখেছি। দিল্লির পাহাড়গঞ্জে
সিম কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটা দিনই ও আমার পাশে ছিল।
যে কোন সমস্যায় এগিয়ে এসেছে সবার আগে। আইডিয়া দিয়েছে। আবার বাস্তাবায়ন
করতেও বাড়িয়েছে সহযোগিতার হাত! সাকিবের মতো কেউ সঙ্গে থাকলে সফরটা সময়টা স্মরণীয় হতে বাধ্য! ভারতে বাংলাদেশের সফর কাভার- মনে রাখাই মতোই স্মৃতি!
Md Shakib,
জন্মদিনে শুধু একটুও বলবো, আসছে বছরগুলো আরও ভাল কাটুক, সব স্বপ্নেরা
ধরা দিক হাতের মুঠোয়; কিন্তু যেমন আছেন তেমনই থাকুন, পাগলাটে, আবেগী আর
কর্মচঞ্চল!